Tuesday, February 25, 2020

নাসির ওয়াদেন

সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন ১টি মাসিক স্বতন্ত্র সাহিত্য প্রয়াস... দ্বিতীয় বর্ষ। পঞ্চম প্রয়াস ।









কাগজ      নাসির ওয়াদেন


           রাগে গজগজ করতে করতে ফিরে যাচ্ছে আনিস ।রাতের গন্ধ গায়ে লাগিয়ে ভোরের কুয়াশা মেখে পাঁচ কিলোমিটার পথ ধাওয়া করে সাইকেল বেয়ে এসে লাইন দিতে হয়েছিল । বেলা গড়িয়ে দুপুর পার, মাথার সূর্য তখন বাইশ দিনের ওম দেওয়া ঘোলাটে, পোক্ত ছানার রূপ পায়নি যেন । একরোখা রোদ বারবার মুখ লুকোচ্ছে, মেঘকে হিংসে করে । উত্তুরে শীতল হাওয়া ভাসিয়ে নিয়ে যায় ইলশেগুঁড়ির ছানাদের। বৃষ্টির হালকা মেজাজ, দোতলার মেয়েটির মুখে রবীন্দ্র সংগীতের সুর, জানালার শিক ভেদ করে ভেসে আসে পিচরাস্তার বুকে ।
   ' যদি নাই হবে, খামোখা হয়রানি কেন ভাই ?
দীর্ঘ লাইন মাথা যখন ছুঁল পোস্টাপিসের বাবুর কাছে, বাবু বলে দিল,' তিনমাসের পর এসো। মগের মুলুক পেয়েছে । আমরা সব ভেড়ারদল! '
      বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যা এসে যাবে তাদের।  'ভুল!  ভুল করবে ওরা, আর তাপ সইব আমরা, কী আজব দেশ রে ভাই ।'
রাগে ততক্ষণে তার রক্তচাপ বেড়ে গেছে । তার পাশে সাইকেল চড়ে যাচ্ছে আবির । দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পাশাপাশি বসবাস ,  আনিসের দাদু আর আবির দাদু দেশ ছেড়েছে সেই  সাতচল্লিশ সালে । আজ ওরা দুজনেই গত। ওপারের জল, হাওয়া তাদের ভাল লাগেনি, তাই পাড়ি দেওয়া । কোথায় যেন বেসুরো আওয়াজ ভেসে আসছে আজ , কালিমালিপ্ত হচ্ছে ভোরের ভালবাসার বাতাস, নিশ্বাস প্রশ্বাসে বিষের গন্ধ । কে ছড়ায় ---
   আবার ভুল । আধার কার্ড । ভোটার কার্ড । ঠিকঠাক না হলে নাকি সমূহ বিপদ, অসম পরিণতি । আঁতকে ওঠে আনিস,  বলে, ' আর বাঁচা যায়?  আমার বাবা জন্মাল এ দেশে, আমি জন্মালুম, আমার ছেলে, তার ছেলে গত মাসে,এখন নাকি  আমাদের সবাইকে প্রমাণ দিতে হবে।
  'ঠিক বলেছিস আনিস,  বলল আবির, আমাদেরও তো ভয় করে ভাই!  আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, স্কুল সার্টিফিকেটের কোন দামই নাই। নতুন জন্ম সার্টিফিকেটের প্রয়োজন ।এই পঞ্চাশ পেরোনো মানুষ কোথায় পাবে বলতো ?'
  -- সেটাই তো মোদ্দা কথা ভাই।
  -- তাকিয়ে দেখ আসাম।গোটা রাজ্য পুড়ছে, আগুন জ্বলছে, কারো কোন হুশ আছে?
এখানেও কি আগুন জ্বলবে ?  পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে আমার বাড়ি কি সুরক্ষিত থাকবে ?
--তুই ঠিকই বলছিস আবির। জন্মালাম এখানে , আর এখন বলছে, প্রমাণ না দিলে কাম্পে পচে মরতে হবে ।
      ওরা  চলছে পিচরাস্তার উপর দিয়ে সাইকেল চড়ে । দুপাশের সারি সারি গাছ, পাখির কলকাকলি,ছন্দস্বর, মাঝেমাঝে রোদের লুকোচুরি । দূরে সবুজ প্রান্তর, রবিফসলের ঢেউ, শরীরের অঙ্গে সোনার গহনা ।
    পিচরাস্তার শেষ, এখন কংক্রিটের রাস্তা । রাস্তার চেহারা পাল্টে গেছে, জীর্ণশীর্ণ রাস্তা হাড়মাস পেয়ে উল্লসিত ।সৌহার্দ্য আর ভালবাসা মুড়ে আছে সোনার বাংলা । সেই সকালবেলায় সূর্য ওঠা, রাখালিয়া সুরে সুরে সূর্যের অস্তাচল গমণ, পাখিদের ঘরে ফেরা, কোন বাধা নেই, কোন বেড়া নেই, আছে শুধু সুন্দরের ঘ্রাণ, অনন্ত ভালবাসা দিগন্তের ভাঁজে ভাঁজে হরিৎ বাতাসের সুগন্ধি।
       মোবাইল বেজে উঠলো আনিসের। ওপার থেকে কন্ঠস্বর শোনা গেল, 'চাচা নেই! আক্রাম চাচা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে ।
    আনিস বিহ্বল হয়ে পড়ে । গত কয়েকদিন ধরে আক্রাম চাচা অস্থির ছিল । দাদুর আমলের বাড়ির দলিল, জমির কাগজপত্র খুঁজে পাচ্ছিল না । দু’হাজারের বন্যায় সব ভেসে গেছে, ভেঙে গেছে আশ্রয়টুকুও। সরকারি সাহায্যে ছোট একটা আস্তানা গড়েছে।
    দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আনিস, আবিরও , দুজনেই ।এর শেষ কোথায় !

আলোক মণ্ডল

সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন ১টি মাসিক স্বতন্ত্র সাহিত্য প্রয়াস... দ্বিতীয় বর্ষ। পঞ্চম প্রয়াস ।










টোলট্যাক্স কালেকটর শ্রীকৃষ্ণ    আলোক মণ্ডল

এখন টোলট্যাক্স আদায়-চিত্র চোখ সয়ে গেছে,জাতীয় সড়কে,রাজপথে।পথ সারাই,আর দেখভালের জন্যেই এ আদায়। যুক্তি সম্মত,বিশেষত যে দেশে সরকার স্বাস্থ্য শিক্ষা পরিবহনের দায় ঝেড়ে ফেলে ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায় সেখানে ট্যাক্স সেস কত কি নিতে হয় তার ইয়ত্তা নেই । কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কেন টোল ট্যাক্স সংগ্রহ করতেন বুঝে উঠতে পারি না, তিনি তো সব কিছুরই দেখভাল করতেন,স্বয়ংভূ  বিশ্ব সম্রাট। ট্যাক্স সংগ্রহ করা তো তাঁর কাজ নয় ! তবু তিনি করেছেন,বেশ উৎসাহের সাথেই!  এ বিষয়ে জেলার কবি চণ্ডিদাস কী বলেন? তিনি তাঁর একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ " শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন কাব্যে" (এখন অর্ধ শতাধিক কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করেও অনেক কবি তাঁর ধারেকাছেও যেতে পারেন নি।) দেখাচ্ছেন, শ্রীকৃষ্ণ রাধার কাছে টোলট্যাক্স  দাবী করছেন এক্কেবারে দু'কোটি টাকা! ভাবতে পারেন,দু'কোটি টাকা ! আর দিতে না পারলে, যমুনা পেরিয়ে মথুরার হাটে দুধদই বেচতে যেতে দেবেন না! সে যে লেবেল থেকেই সুপারিশ আসুক না কেন তিনি টাকা না পেলে ছাড়বেনই না! এমনই কঠিন তাঁর ফরমান! 
বিকল্প পথ একটা অবশ্য আছে ,সেটা শ্রীকৃষ্ণই বাতলে দিয়েছেন। এখন কোন্ পথ শ্রীরাধা নেবেন সেটা নির্ভর করছে তিনি কী ভাবে পরিস্থতি ট্যাকেল করছেন তার ওপর। তবে আশ্চর্য হই এই ভেবে, এতো মোটা অঙ্কের টোল এযুগেও কি এককভাবে কারো ওপর চাপানো হয়েছে!তাও আবার নিছক এক জন সামান্য গোয়ালিনীর ওপর!যে যমুনা পেরিয়ে দুধ বেচে খায়! যাক সে কথা , কবি চন্ডিদাস বলছেন, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুু নেই। দাবীটিও নাকি যুক্তি সংগত এবং বিকল্প পথটি ন্যায়সঙ্গত।
আসুন দেখি, কী করে এ্যাতো টাকার দাবী নাহ্য হোল! কবি বলছেন, শ্রীকৃষ্ণ অনেক হিসেব করেই ট্যাক্স ক্যালকুলেশন করেছেন, কোথাও ভুল বা অবাঞ্ছিত কিংবা গোপন হিসেব নেই। তাঁর হিসেব মতো শ্রীরাধার মাথায় যে কুসুম মালা তার দামই ১ লক্ষ টাকা,কেননা তা স্বর্গের পারিজাত ফুলের মালা। তাঁর চুলের দাম ২লক্ষ যে চুলে শম্পা বনের ঢেউ,এখন হলে হয়তো ঐ চুলে বিদিশার রাত্রির অন্ধকার খুঁজে পেতেন।সতী সাবিত্রীর মতো তাঁর মাথার সিঁথির সিন্দুরের দাম ৩ লক্ষটাকা,পূর্ণশশির মতো শ্রীরাধার মুখের দাম ৪ লক্ষটাকা,কেননা ঐ মুখশ্রী অনন্ত সৌন্দর্যের আয়না,নীলোৎপল নয়নযুগলের দাম ৫ লক্ষটাকা,কেননা ঐ চোখের ইশারায় কত যুবকের বুকে ওঠে তোলপাড় ঢেউ, গড়ুঢ়ের মতো নাকের দাম ৬ লক্ষ টাকা,দু'টি কান যেখানে সারাক্ষণ দুলে হাসি কান্নার মতো রত্ন মানিক্য তার দাম ৭ লক্ষটাকা, মানিক্যজয়ী রাধার দাঁতের দাম ৮ লক্ষটাকা কারন ক্লোজআপের ঝকঝকে দাঁতে হাসির চেয়েও উজ্জ্বল! বিম্বফলের মতো তাঁর অধরের দাম ৯ লক্ষটাকা,কেননা সেই অধরে লেখা আছে চিরন্তন চুম্বনের স্মৃতিকথা, কুম্বসম কণ্ঠের দাম ১০ লক্ষ,পদ্মের সরু নালের মতো অর্থাৎ মৃণালের মতো নির্মেদ শ্রীরাধার দু'বাহুর দাম ১১ লক্ষ টাকা,চাঁদের মতো শ্বেতশুভ্র নখের দাম ১২ লক্ষ, শ্রীফলের মতো সুঢৌল তাঁর স্তনযুগলের দাম,১৩ লক্ষ টাকা কেননা তা চিরন্তন প্রেমের লীলাভূমি! ক্ষীণতম( জিরো ফিগার) শ্রীরাধার কটিতট(কোমর)-র দাম ১৪ লক্ষটাকা, কদলীসম ঊরুদ্বয়ের দাম ১৫ লক্ষ, চরণযুগল ১৬ লক্ষ,  যে চরণে ভুল করে ফুল ভেবে প্রজাপতি উড়ে এসে বসে এবং হেমপাট নিন্দিত শ্রীরাধার জঘন-এর দাম ৬৪ লক্ষটাকা।  তাহলে,যোগ করে দেখুন,কোথাও ভুল আছে কি?  সর্বমোট ২ কোটি টাকা টোলট্যাক্স হচ্ছে তো? 
শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার কাছে এই দাবীটুকুই করেছেন এবং তৎকালে এটা বাস্তবসম্মতও ছিল। নগদে ঐ টাকা দিতে না পারলে অবশ্যই বিকল্প পথও ছিল এখনও যেমন আছে। তবে সংগ্রাহকের উপর নির্ভর করছে, তিনি কোন ধরনের বিকল্প দেবেন। আমাদের রাধাই বা কোন পথ বেছেছিলেন,সে বিষয়ে আমি আর কিছু বলছি না,  খোঁজ পেতে "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন"কাব্যের' দানখণ্ড' পাঠ করুন, বিকল্প পথের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

বেবী সাউ

সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন ১টি মাসিক স্বতন্ত্র সাহিত্য প্রয়াস... দ্বিতীয় বর্ষ। পঞ্চম প্রয়াস ।










উড়োচিঠি    বেবী সাউ  

৫৭. 
আমরা লিখতে এসেছি! আমরা কিছু লিখতে চেয়েছি! কেন? খ্যাতির জন্য? পুরস্কারের জন্য? নাকি প্রচুর বিজ্ঞ বলে? নাকি আমাদের মধ্যে এত জ্ঞানের ছড়াছড়ি যে না লিখে ছড়ালে পৃথিবী মূর্খ থেকে যাবে? উঁহু! এর কোনটাই কারণ নয়। কোনটাই আমাদের লেখাকে,  লেখাটি লেখার সময় এসব কারণ প্রভাবিত করে না,  মনেই থাকে না। তারচেয়ে, আমার মনেহয়, লেখা যেন এক সাধনা--- নিভৃত,নিবিড়, নিবিষ্ট সাধনা। চুপচাপ ধ্যানের মতো।  ব্যক্তিগত জীবনের প্রান্তে এসে যখন সেই সাধনার কাছে হাত পেতে দাঁড়াই, একা একা মুখস্থ করি নিজের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব, দেখি নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগা, অনুভূতি, অনুভব আর ভীড়, ভীষণ ভীড়ের পৃথিবীতে প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার মতো 'একলা আমি' খড়কুটো ভেবে আঁকড়ে ধরি অক্ষরকে। তখন অক্ষর আমার বন্ধু, ভগবান, মা-বাবা--- অক্সিজেনও। সেই অক্ষরদের নিয়ে আমি আবার বেঁচে উঠি, স্রোতে ভাসতে ভাসতে কুল পেয়ে যাই... ঘর বসত গুছাই। জন্ম জন্মান্তরের সখ্য, নির্ভরতা আমাকে দেয় এই ৫২টি অক্ষর!  বাংলা ভাষা! সাদা একটা পৃষ্ঠা আমাকে মুক্তির আকাশ দেখায়, শান্ত নিবিড় ছন্দ শেখায়--- শেখায় এই মুখোশের পৃথিবীতে একমাত্র অক্ষরই বন্ধু, সখা এবং ঈশ্বর! 

আর তখনই বাংলা ভাষাটি আমার কাছে হয়ে ওঠে বেদমন্ত্র!  

  এই ভাষাটিকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। জানিনা এর কারণ! সে হিসেবে দেখতে গেলে বাংলায়, আমাদের দেশের বাড়িতে আমি থেকেছি মাত্র পনেরোটা বছর। মাধ্যমিক দেওয়ার পরেই ঝাড়খণ্ডে চলে আসি। এখানেই বাদবাকি পড়াশোনা। আর এখানে পেপারওয়ালা থেকে ঝাড়ুদার... সব্জী মার্কেট থেকে কলেজ ক্যাম্পাস... গেট কিপার থেকে আমার বন্ধুমহল সবাই হিন্দি কিংবা ইংরেজিতে কথা বলে। আমারও ওদের সঙ্গে হিন্দি,  ইংরেজিতেই যা কিছু আলাপ, আয়োজন।  এইযে আমি কবিতা লিখি, এইযে, যাইহোক না কেন, সামান্য লেখালিখি করি আমার বন্ধুরা এসব জানেই না! জানলে হয়ত বলতো--- " ব্যা...ঙ্গো...লী পোয়েম!!!" আমাদের বাড়িতেও কখনও বাংলা সাহিত্যের কোনও জায়গা নেই। বাবা, পিসি, কাকা, দাদু সাহিত্য নিয়ে কখনও দু'লাইনও লেখেননি। বাংলা কবিতা লিখছি বলে, পড়ছি বলে আমার ভাই সবসময়ই আমাকে টিটকিরি মারে...
সুতরাং আমার লেখা সম্পর্কে কিছু জানার জন্য, লেখাগুলো কিছু হচ্ছে কি না জানার জন্য আমাকে ফেসবুকে আসতেই হয়। ফেসবুকেও যে কোনও স্বচ্ছ মতামত পাই, তা নয়... কিন্তু ফেসবুকটাই আমার 'বাংলা জানলা'...বাংলার ওয়েব ম্যাগগুলো আমার সাহিত্য চর্চার উঠোন...লিটল ম্যাগাজিনগুলো না থাকলে আমার এই ছাইপাঁশ লেখা আদৌ কী প্রকাশিত হতো! 

কবি গৌতম বসু একবার আমাকে বলেছিলেন,  'তুমি দূরে থাকো বলেই এত ভালো ভালো কাজ করতে পারছ!' আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম, "এখান থেকে বাংলায়  কাজ করাটা একটা বিপ্লব। হাতের কাছে বই নেই, আলোচনা করার লোক নেই, কেউ গাইড নেই, বন্ধু নেই। এমনকি কোনও মাধ্যমও নেই..." কলকাতার সঙ্গেও আমি পরিচিত নই...হয়ত কলকাতায়ও আমি উপেক্ষিত... তাই যখন কাঁদনাগীত নিয়ে কাজ করি তখন কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিল...আমি যখন কবিতা লিখি, কবিতার বই বেরোয় তখন হুমকি দেওয়া হয়... আজেবাজে কথা ছড়ানো হয়... যেহেতু আমি দূরে থাকি, আমার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়মিত এই জগতের ওঠাপড়া থাকে না, এমনকী তাঁরা এটিও জানেন না যে আমি কোন বিষয়ে কতটা অ্যাকাডেমিক পড়াশুনো করে চলেছি ( জানলে হয়ত একটু ভেবে বিরক্ত করতেন) কী যে লাভ এতে! কী হয় এতে! আমরা এত অধৈর্য কেন? আমরা এত ঈর্ষাকাতর কেন সামান্য এই ক'টি অক্ষরের কাছে? পংক্তির কাছে? আমরা কী সুষ্ঠু, নিবিড় সাধনার পরিবেশ তৈরি করতে পারি না? যাতে সকলে মিলে হাঁটতে পারি! একে অপরের অক্ষর শেয়ার করতে পারি! ব্যক্তিগত কেচ্ছা ছাড়িয়ে অক্ষরের আলোয় বন্ধু হয়ে উঠতেও তো পারি!

 আমরা, আমি লিখতে চাই। লেখায় থাকতে চাই। কেননা, লিখতে না পারলে মাথা ধরে, বমি পায়... কষ্ট... কষ্ট...

কিন্তু একটা কথা বলি, এত প্যান্ডেল থাকবে না। এত সানাই থাকবে না, এত গেট টুগেদারও থাকবে না। শত শত সাম্রাজ্য ধুলোয় হারিয়ে যাবে। 
যদি কিছু লিখতে পারি, সেটাই থাকবে, যদি একটিও কবিতা লিখতে পারি, যদি একটিও কখনো....

চিরকাল লেখাই থাকে,  রক্তাক্ত অক্ষরগুলি থাকে, তার জন্য হাঁটুমুড়ে ভিক্ষা করতে হয় সময়ের কাছে, এত জেনে গেলে হয় না। 

কারণ ক্ষমতা এক অশ্লীল ও পঞ্চম শ্রেণির গর্ত মাত্র।

চন্দ্রদীপা সেনশর্মা

সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন ১টি মাসিক স্বতন্ত্র সাহিত্য প্রয়াস... দ্বিতীয় বর্ষ। পঞ্চম প্রয়াস ।










সরধুনী    চন্দ্রদীপা সেনশর্মা

বইমেলার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ধুনী নিজের ভিতরে টুকরো হতে থাকে। মনে মনে সামনে এগিয়ে যায়। সামনে মানে গন্তব্যহীন অদৃশ্য সেতু।সেতুর নীচে খরস্রোতার তীব্র টান। ধুনী যেমন দাঁড়িয়েছিল সেভাবেই মুখ তুলে আকাশে তাকায়। মেটে রঙের গালিচার মতো ভারী মেঘ বায়ুকোণে।বায়ুকোণে কি না কে জানে! মনে হয়। মনে কতো কী হয়, পাটভাঙা স্মৃতি নড়েচড়ে বসে।ধুনী এবার শহরের পথ দেখে। সেখানে তার অপেক্ষায় পনেরোশো স্কোয়ারফুট নিখুঁত সাজানো।কাছাকাছি মলে যাওয়া আছে।কিছু কেনাকাটা আছে। মাঘীপূর্ণিমার গায়ে বইমেলার রকমারি ফেস্টুন উড়তে থাকে। তার 'মাঘ সংক্রান্তির রাতে' কবিতা পাঠের ইচ্ছে হয়।

     মৃত্যুগন্ধ মেখে রাত দাঁড়িয়ে আছে। কত জটিল অসুখ চারিপাশে।ধুনী অপারেশন টেবিলে এসব জটিলতা পার হয়ে এসেছে।চারবার। আজকাল জটিলতা ভালো লাগে না।সহজ কথা শুনতে চায়, সহজ পথে যেতে যায়। সামনের দিকে অভবি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অদৃশ্য সেতু পেরোলেই বাণপ্রস্থ পথ,হয়তো।পূর্ণিমার আলোর গায়ে ছলাৎ শব্দে স্রোতস্বিনী ধাক্কা মারে।টুকরো হয়ে যায় চাঁদ। পূর্বাভাস, জমাট মেঘ আগামীকাল বৃষ্টি নিয়ে আসবে।ধুনীর স্মৃতিপথে পুরনো বৃষ্টিপাত, ঘন সন্নিবিষ্ট। সে রাতে মেহগনি আলো চোখে নিয়ে কেউ এসেছিল।অনেক মানুষের আড্ডায় ধুনীর চোখ সে আলো খুঁজে নিয়েছিল। স্পর্শ কি শরীরের? না ছুঁয়েও ছোঁয়াচে জ্বর এসেছিল।

    মেঘের জমায়েতে বইমেলার ফেস্টুনগুলো দেখা যাচ্ছে না। পূর্ণিমা এখন অনেকটাই নিষ্প্রভ। ফেস্টুনগুলো কাটাঘুড়ির মতো মুখথুবড়ে পড়েনি তো? ধুনীর প্রত্যাশা কি উড়তে উড়তে কাটাঘুড়ির মতো মাটি ছুঁয়েছো? কোন সীমানায়? ব্যস্ত সড়ক চল্লিশ পঞ্চাশ গতি ছুঁয়ে ছিটছে।

মৌমিতা পাল

সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন ১টি মাসিক স্বতন্ত্র সাহিত্য প্রয়াস... দ্বিতীয় বর্ষ। পঞ্চম প্রয়াস ।










রুরু    মৌমিতা পাল

যা বলার এখনি বলে নিই।আনন্দে ডুবে গেলে চুপ করে যেতে হয়।বোধ আর বিষণ্ণতার আড়ালে আমাকে বরাবর গ্রাস করেছে আনন্দই।নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতটুকু করি , আর যেসব অসার ঢক্কানিনাদ তারপর আরো বেশী করে মনে হয় মুছে ফেলি যাসব লিখেছি এতদিন।স্তাবকদের ভীড়ের মাঝেও সেদিন প্রাসঙ্গিকভাবে চিনে নিয়েছিলাম কোন কোন স্নেহ।মানুষের মালিন্য আমাকে বিমর্ষ করে।ঔদ্ধত্য , উচ্চৃঙ্খলতাকে আমি ঘৃণা করি।ইচ্ছা করে প্রতিটা আঘাতের কিংবা অনুশীলিত ছলের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিই আলেপ্পোর মিউজিয়ামে রাখা ফিশারম্যানের ছবিটা।ছবিটা হামুরাবির সময়কালের, রাজা জিমরিলিমের মারীর প্রাসাদের অখণ্ড দেওয়ালচিত্র।ব্রাউন পশ্চাৎপটের ঠিক বৈপরীত্যে কালো বর্ডারের মাঝে সেই জেলের শারীরিক বিভঙ্গ আঁকার যে শক্তিশালী শৈলী তা আমাকে নীরবে চিনিয়েছিল শৈলীর অতিরিক্ত প্রগাঢ় জীবনকে। আমাকে মোটামুটি অনুমান করতে পারে সেও জানে না , সময়কে আমি বিস্তর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছি অসময়ের মতলব বানচাল করে।সাফল্য আর যাই হোক আমাকে কখনো যেন উন্নাসিক না করে তোলে।উন্নাসিকদের মগজ কোন এককালে প্রখর হলেও , শেষমেষ ভোঁতাই হয়ে যায়।ধারটা যেন নাকে নয় , মগজেই থাকে।

আপন মনে বকে যাচ্ছিলাম এসব বাগবাজার ঘাটে দাঁড়িয়ে রুরু।ঘরে ফিরছিলাম।আমার চারপাশে প্রীতির ঠিক পাশে পাশেই জড়ো হচ্ছিল শত্রুও।এখন ঠিক চিনে নিতে পারি , ইনটিউশনটা ক্রমশ আরো প্রবল হয়ে উঠছে বলেই।এই সময়গুলোতেই ঘরে ফেরার তাগিদ প্রবল হয়ে ওঠে।মা মাছ ভাতের গরাস মেখে মুখে তুলে দেবে ঘরে এলেই।বাগবাজার ঘাটে তখন কোন কোন জন শ্রাদ্ধ করছিল ।যেখানে মানুষ শাখা ভাঙ্গে সেখানেই নতুন শাখা পরে কোন জন।এক ঘাটেই সারি সারি পসরা সাজিয়ে বসেছিল ব্যবসায়ীরা।ভীড় হয়েছিল অনেকেরই।কেউ পুজো দেবে , কেউ শ্রাদ্ধ , কেউ শুধুই স্নান।ঘাট লাগোয়া চক্ররেলের স্টেশনে মিলেনিয়াম পার্ক থেকে ফিরছিল প্রেমিক যুগল।আমি তোর সঙ্গে দেখা না করে তোর শহর থেকে একলাই ফিরছিলাম।নৌকা থেকে ছোট ছোট মাছ নামাচ্ছিল কোন জন।অন্য দিন হলে কিনতাম।আজ না কিনেই ঘরে ফিরব ঠিক করলাম।কতদিন তোর সঙ্গে মাছ নিয়ে ঝগড়া করিনি।অন্যমনস্কভাবে পথে দেরী করে ফেলছিলাম।হঠাৎ খেয়াল হল আজ নীলমের আমার ঘরে আসার কথা। জানি না , ও কেন আসতে চেয়েছিল ! তবে মুর্শিদকে জানাইনি এসব।প্রতিটা ব্যক্তি মানুষের আলাদা অস্তিত্ব থাকে জীবনে।একটার সঙ্গে আর একটাকে না গুলিয়ে ফেললেই হল।

জীবনের ক্লেদ ক্লান্তিতে যখন বেঁচে থাকাকে বড়ো ভুঁইফোঁড় প্রবণতা মনে হয় যখন , তখন সন্দেহ আর চারপাশের ব্যভিচারকে অতিক্রম করে রুরু তোর ভালোবাসায় ফের অর্কেস্ট্রা শুনছি।বর্ষা নয় , হেমন্ত প্রিয় ঋতু আজকাল।রুরু , তোর আমার বাইরের যোগাযোগটা কোনদিন নিভে গেলেও একরোখা কবির মতো প্রেম লিখেই যাব আমৃত্যু।উপনিষদে বলা আছে - 
" অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে অবিদ্যামুপাসতে
ততো ভূয়ো ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতা।"
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর 'গীতাপাঠ' গন্থে এর টীকাভাষ্যে বলেন -'যাহারা অবিদ্যার উপাসনা করে তাহারা অন্ধ তিমিরে প্রবেশ করে।তাহা অপেক্ষা আরো ঘোরতর অন্ধ তিমিরে প্রবেশ করে যাহারা বিদ্যায় রত।' আমি তাই বিদ্যা কিংবা অবিদ্যার দ্বন্দ্ব নয় ভালোবাসাকে সম্বল করেছি , জ্ঞানকে পাথেয় করেছি , কর্মকে সঙ্গী আর যোগকে অভ্যাস।  বোধ আর অভিজ্ঞতা আমার গুরু।পথই ঘর , ঘরই পথ।তাই রুরু তোকে ভালোবাসতে আমার তোকেই লাগবে না। গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তোকে পেয়ে বর্তে যাক , আমি একটা পাহাড় জাপ্টে দ্বীপান্তরে যাবই।ঈশ্বরের প্রেমিকা বলেই রুরু, তোর প্রতি আগ্রহ বা আকাঙ্ক্ষা কোনটাই এ জীবনে যাওয়ার নয়।
                                                            ইতি
                                                        অপ্রেমিকা