Thursday, January 15, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৫]


মন্দাক্রান্তা 



নাগরিক সিনেমাটিকে নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে কিছু তথ্য দিয়ে দিই ---

{ নাগরিক

প্রযোজনা: ফিল্ম গিল্ড, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিক ঘটক

কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ঋত্বিককুমার ঘটক

আলোকচিত্র: রামানন্দ সেনগুপ্ত

সম্পাদনা: রমেশ যোশী

সঙ্গীত: হরিপ্রসন্ন দাস

ধারাভাষ্য: ঋত্বিককুমার ঘটক

অভিনয়: প্রভা দেবী, শোভা সেন, কেতকী চ্যাটার্জি, গীতা সোম, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য, অজিত ব্যানার্জি, কালী ব্যানার্জি, কেষ্ট মুখার্জি, গঙ্গাপদ বসু, শ্রীমান পিন্টু, পারিজাত বোস, মমতাজ আহমেদ খান,  অনিল চট্টোপাধ্যায়, উমানাথ ভট্টাচার্য, অনিল ঘোষ, কানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

মুক্তির তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭

প্রেক্ষাগৃহ: নিউ এম্পায়ার }


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তজীবনের ভাঙনের ছবি 'নাগরিক'। মুখ্য হলেও, এ ছবির সামগ্রিক পরিচয় কিন্তু এটাই নয়। উপেক্ষা করা যায় না ছবির গৌণ দিকটিকেও-বর্তমানের ভয়াবহতাকে স্বীকার করার পরও সমস্ত ছবিটি জুড়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুর্নিবার এক প্রত্যয়ের সুর। আলংকারিক অর্থে তো বটেই, আক্ষরিক অর্থেও। বিপ্রতীপ এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব মুহুর্মুহু দর্শকের চেতনায় আঘাত করে তাকে সচেতন থাকতে বাধ্য করে।

মা বাবা দুই ছেলে এক মেয়ে-এই পাঁচজনকে নিয়ে নাগরিক-এর পরিবার। এরা পূর্ববাংলা থেকে আগত উদ্বান্ত নয়; না হলেও, শিক্ষকতা থেকে বাবা সুরেশ বাগচী অবসর নিলে, শ্যামপুকুরের বড়ো বাড়ি ছেড়ে তাদের উঠে আসতে হয়েছে কলকাতার এক ঘিঞ্জি পাড়ায়, চার পাশ চাপা স্যাঁতসেতে একটা বাড়িতে। বড়ো ছেলে রাম্ সাবালক হলেও স্বাবলম্বী নয়, এখনও বেকার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ডামাডোলে চাকরি জোটানো মুখের কথা নয়। বাবার পেনশনটুকুই পরিবারের ভরসা-ওই যৎসামান্য আয়ে কায়ক্লেশে গ্রাসাচ্ছাদন যদিও বা হয়, সুস্থভাবে বেঁচে জীবনটাকে আরেকটু বর্ণময়, উপভোগ্য করে তোলা অসম্ভব। সৎ আদর্শবাদী পিতা জীবনের প্রান্তে বসে ভাবেন, এ আমরা কোথায় এলাম: 'আমাদের বাংলা ছিল গড়া বাংলা। আজকের বাংলা হচ্ছে ভাঙা বাংলা।... একটা পুরোনো দালানের মতো দেশটা ভেঙে পড়ছে।'

 হেঁশেল ঠেলে ঘরদোর সামলিয়ে মা'র দিন যায়; ফেলে-আসা বাড়ির জন্যে আক্ষেপ তাঁর ঘোচবার নয়: 'বাড়িটা যেন হাড়েপাঁজরায় মিশে আছে।' হাঁপ-ধরা সংকীর্ণ পরিবেশে মা'র মতো রামুর মনও ঘুলিয়ে ওঠে, মুক্তির স্বপ্ন দেখে সে। সেই-স্বপ্নের বিশ্বাস্য চিত্ররূপ সে খুঁজে পেয়েছে নোনা-ধরা দেয়ালে টাঙানো পুরোনো একটা ক্যালেন্ডারের ছবিতে: তাতে আঁকা, দিগন্তলীন মাঠের মাঝখানে একখানা লাল টালির বাংলো। রামু নিত্য নিজেকে স্তোক জোগায়, আর কয়েকদিনের ভেতরেই সে চাকরি পাবে-পেলেই, প্রেমিকা উমাকে বিয়ে করে অমনই এক খোলামেলা জায়গায় ঘর পাতবে দুজনে; রূপকথার শেষে যেমন হয়, 'অতঃপর তাঁহারা সুখে-শান্তিতে রাজত্ব করিতে লাগিলেন', তেমনিভাবে 'করিতে লাগিলেন'-এর মতো নিরন্তরতাবোধক স্বস্তিদায়ক যৌগিক ক্রিয়ার আবেষ্টনে গুছিয়ে নেবে সাধের সংসার। রামুর এই সুখকল্পনা সম্পর্কে নাগরিক-এর প্রচারপুস্তিকায় ঋত্বিক লিখেছিলেন: 'রামুর। চোখে স্বপ্ন... একটি নীড় বেঁধে উমার সঙ্গে তার দিন কাটবে মন্দাক্রান্ত তালে।"

'মন্দাক্রান্তা': শব্দটি নাগরিকের সঙ্গে 'মেঘদূত'-এর, রামুর সঙ্গে ঋত্বিকের অন্যান্য যক্ষসদৃশ নায়কদের আত্মীয়বন্ধন নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয়। ১৯৪৭-এ প্রকাশিত 'এক্সট্যাসি' গল্পের ক্লান্ত তিক্ত প্রাক্তন দেশকর্মী, মধ্যপ্রদেশের জংলা রুক্ষ প্রকৃতি আর গভীর নীল আকাশের কাছাকাছি পালিয়ে যায়; নির্জন প্রান্তরে শুয়ে-বসে ধীরে-সুস্থে বাকি কটা দিন কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার। সে ভাবে: 'না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরা, কিছু না বুঝে ছুরি খেয়ে শেষ হওয়া, বীভৎসতা আর দৈনন্দিন জীবনের শত-সহস্র বেদনা, এবং তারই পাশে ধনিকের টাকার জোরে সমগ্র শাসন-যন্ত্রটাকে হাতে ক'রে উল্লসিত উদ্দাম পৈশাচিকতা, এর বিরুদ্ধে আমি কি করতে পারি?... তার চেয়ে এই ভালো।...কি ভালো যে লাগছে, বলতে পারি না। এ সেই কালিদাসের মেঘদূতের দেশ, আমাদের অলকার দেশ।' যদিও সে জানে বনে-বনান্তরে যে রস ক্ষরিত হচ্ছে তাতে  লীন হলে পাগল হয়ে যাবে তবু ওখানেই রয়ে যেতে বদ্ধপরিকর সে। তার যাই হোক, একসময় কি রামুর অসহ্য লাগবে না ও-আত্মরতি, 'আকাশগঙ্গার স্রোত ধরে' গল্পের নায়কের মতন তাকেও কি শুনতে হবে না কথকের সেই ধিক্কার: 'গর্দভ।'



ছবিঋন: গুগল


No comments: