Sunday, January 25, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৭]



এক ভবিষ্যতদ্রষ্টা তরুণ পরিচালকের পদধ্বনি
.....................................................................


কথক-স্বর গোপন রাখবার কোনো প্রয়াস 'নাগরিক'-এ নেই। পাত্রপাত্রীদের বিশেষ কিছু মন্তব্যে কথক-কণ্ঠ পরিষ্কারভাবে উপস্থিত। বাগচী পরিবারের পেয়িং গেস্ট, রসায়নবিদ সাগর সুরেশবাবুকে বলে, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে এত শোচনীয়, তার মূল কারণ, শোষণ; মানুষের এই দুঃখকষ্ট আসলে অর্থহীন। বর্তমান বাংলা যাঁর চোখে জীর্ণ দরদালানের মতো, সেই সুরেশবাবু রামুকে বলেন, 'ভাঙাটাকে মানলে গড়ার রাস্তাও দেখা দিতে পারে।' রামুর বামপন্থী বন্ধু সুশান্ত তাকে সেই গড়ার রাস্তাটাই দেখাতে চায়: যে-পুঁথিতে মানুষের অনেক অভিজ্ঞতা জমা আছে তাকে ঠিকমতো কাজে লাগিয়ে জীবনের সঙ্গে এক করে নেবার পরামর্শ দেয়, রামুকে সংঘবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলনের শরিক হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। বাড়িভাড়ার দায়ে ঘরছাড়া, খ্যাপাটে আধবুড়ো যতীনবাবু বস্তিবাড়িতে উঠে যাবার সময় রামুকে তার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়: 'সুশান্তবাবুর কথাগুলো মনে পড়ছে; আমাদের সকলের পথই ওই এক জায়গাতে গিয়েই শেষ হবে।' যতীনবাবু, সুবর্ণরেখা-র হরপ্রসাদের পূর্বসূরি; রঙ্গপ্রিয় স্বপ্নপাগল হরপ্রসাদ যেমন সদাগম্ভীর সাংসারিক ঈশ্বরের, তেমনি যতীনবাবুও রামুর অতিকৃতি, কমিক আত্মস্বরূপ'-সহজ, একের মধ্যে আরেকজনকে আবিষ্কার করা। আর আছে এক রহস্যময় বেহালাবাদক -হঠাৎ-হঠাৎ উদয় হয়ে গল্পের জোড় ভেঙে দেয়। বেহালাবাদকের একটা বিশেষ সুর রামুকে নেশার মতো পেয়ে বসে, কিন্তু যতবারই রামু তাকে সুরটা বাজাতে অনুরোধ করে, বক্রব্যঙ্গের হাসি হেসে সে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। কে এই বিস্ময়কর বাজনদার? বিবেক? ইতিহাসপুরুষ? বেহালায় ছড়ের টান, কামারশালার আওয়াজ, আন্তর্জাতিকের সুর-সাউন্ড ট্র্যাকের বিন্যাসেও স্পষ্ট কথকের পথনির্দেশ। এই ছ'টি দৃষ্টান্ত থেকে নাগরিক-এ কথক-স্বর প্রক্ষেপণের রীতিবৈচিত্র্যের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়: কোথাও সরাসরি বাচনিক, কোথাও তির্যক, প্রতীকী। ঋত্বিকে কথক-কণ্ঠ চিরকালই সোচ্চার-কেবল তাঁর ছবিতে যত পরিণতমনস্ক হবে, তত কঠিন হবে বাচনিক-অবাচনিকের ক্ষেত্রবিভাজন। নাগরিক-এ কথক, যেন পদাধিকারবলেই, একটু উঁচু থেকে আত্মবিভোর রামুদের ওপর তদন্ত চালায়, ভর্ৎসনা করে। কিন্তু এর পর থেকে, উচ্চাসনের যত বিশেষ সুযোগ-সুবিধে এক একে সব ছাড়তে হয় ঋত্বিকের কথককে; সংশয় আর জিজ্ঞাসায় ক্ষতবিক্ষত হতে-হতে, যুক্তি তক্কো গপ্পো-য় অবশেষে নেমে আসতে হয় অন্যদের সমতলে। কিন্তু যতই ক্ষমতাধর হোক, একা কথক কি নাগরিক-এর রামুকে ঘরের বাইরে টেনে আনতে পারত-ভেতরের চাড় ছাড়া কি কেউ মঙ্গলসমাচারে কান দেয়? রামুদের আত্মজ্ঞানের যা প্রধান অন্তরায় তা-ই যদি অশনাক্ত থাকে তা হলে তো শত আন্তরিকতা সত্ত্বেও মুক্তির আয়োজন পন্ড হতে বাধ্য। কী সেই অন্তরাল ?

বহির্বিশ্বের চাপে পারিবারিক বিপাক, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে ঘরোয়া ব্যবস্থার সংঘাত, বাংলা গল্প-উপন্যাস-নাটক-চলচ্চিত্রের একটি প্রিয় বিষয়। এই সমস্যাটি সাধারণত যেভাবে উপস্থাপিত  হয়, তাতে মনে হয় যেন, বস্তুদুনিয়া আর পরিবারকেন্দ্রিক আবেগজগৎ মানবজীবনের দুই আলাদা এলাকা-এতদূর আলাদা যে প্রথমটিতে ক্ষয়বৃদ্ধি অদলবদলের বিড়ম্বনা থাকলেও দ্বিতীয়টিতে' তেমন কোনো ঝঞ্ঝাট নেই, সমস্তকিছুই সেখানে সংগত এবং সনাতন। যেন, আমাদের সংসারের একপ্রান্তে রয়েছে বিবর্তন-পরিবর্তন, অন্যপ্রান্তে নিত্যআবর্তন, একধারে সামাজিকের অনিশ্চয়তা অন্য ধারে স্বাভাবিকের বরাভয়। এই বর্গবিভাগ তথাকথিত জনপ্রিয় শিল্পসাহিত্যের মুখ্য অবলম্বন--ওই সব-খোল চাবিখান আছে বলেই আপতিকের দুর্ঘটকে আবশ্যিকের প্রত্যয়ে শামাল দেওয়া সোজা। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা এবং আবেগব্যবস্থা যদি একে অপরের বিপরীত এবং পরিপূরক হয়, তা হলে দেশ-কালে যাই হোক-না-কেন, বিভিন্ন পারিবারিক আদিরূপে ঘা পড়ে না: সব-বহা সব-সহা মা'র মমতায় ঘাটতির প্রশ্ন ওঠে না, ভাইবোন সম্পর্ক যথারীতি নির্মল অপাপবিদ্ধ রয়ে যায়, বড়োছেলে আত্মদানের শরৎচন্দ্রীয় আদর্শে সংসারের যুপকাষ্ঠে নিজেকে বলি দেয়, ইত্যাদি প্রভৃতি। পারিবারিক সম্বন্ধগুলোকে শুধু মৌলিক নয়, নিষ্কলুষ এবং ইতিহাস-ঊর্ধ্ব দেখিয়ে বহু সংকটের চটজলদি সুরাহা করা যায়-পারিবারিক মতাদর্শকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নিলে যে সমাজজিজ্ঞাসারই বিশেষ কোনো অর্থ থাকে না, এই চেতনাটাই হারিয়ে যায় তখন। ঋত্বিক সেই বিরল শিল্পীদের একজন যাঁর চোখ-ঠারার এই চেষ্টা নেই-উলটে তিনি কেবলই মানবসম্পর্কের না-বলা বিপজ্জনক সব অঞ্চলে নিয়ে যান আমাদের। নাগরিক-এ, পরে আরও সফলভাবে মেঘে ঢাকা তারা এবং সুবর্ণরেখা-য়, চিরচেনা পারিবারিক ভুবন ও নিত্যধার্য মূল্যবোধ থেকে যাত্রা শুরু করেও প্রত্যাশিত গন্তব্য থেকে দূরে সরে যান ঋত্বিক। বহুদিনযাপিত সংস্কারের বশে আমরা যাকে সমাধান বলে ভাবি, তাকেই তিনি পালটে দেন সমস্যায়।

নাগরিক-এ বিয়ের অপেক্ষায় বসে-থাকা বদ্ধ ঘরে বন্দী বোন সীতার অবস্থা রামুর সারা শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। এই জ্বালা থেকে কী সাংঘাতিক কান্ড হতে পারে তার একটি নিদর্শন ঋত্বিকের 'এজাহার' গল্প। ভবেশরঞ্জন বাগচী বোন জয়ার শ্বশুরবাড়ি এসে বোঝে এক যৌনরোগগ্রস্ত লম্পটের সঙ্গে তার বোনের বিয়ে হয়েছে। অসুখী, অন্তঃসত্ত্বা বোনকে প্রথমে সে গৃহত্যাগের, পরে আত্মহত্যার পরামর্শ দেয়; দুটোর একটাতেও জয়া রাজি না হলে তাকে নিজের হাতে গলা টিপে মারে ভবেশরঞ্জন। একপাশে নির্দয় স্বামী অন্যপাশে ঘাতক ভাই, কে যে বেশি ভয়ংকর জয়া কি তা জানে! বোনের অসহায়ত্ব ভাইয়ের মনে উশকে তোলে হননেচ্ছা, খুলে দেয় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে নিহিত হিংস্রতার মুখ। সুবর্ণরেখা-য়, বোনের প্রতি দমিত অথচ অনির্বাণ আকর্ষণেই সীতার কাছে পৌঁছে যায় ঈশ্বর; মেঘে ঢাকা তারা-য়, মা-মেয়ের এবং দুই বোনের দ্বন্দ্বই বানচাল করে দেয় নীতার জীবন। নাগরিক-এও দুই বোন আছে-রামুর প্রেমিকা উমা আর শেফালি। শেফালি, স্বেচ্ছায় নয়, টিঁকে থাকার অনমনীয় জেদেই বেছে নেয় বেশ্যাবৃত্তি।
নাগরিক-এ দুই বোনের গল্প সমান্তরালভাবে এগোলেও মেঘে ঢাকা তারা-য় গীতার সুখস্বাচ্ছন্দ্যই নীতার কাছে কাল হয়ে আসে। নাগরিক-এর শেষে রামু ভদ্রলোকপাড়ার পাট চুকিয়ে নীচের তলার ঘনবসতির দিকে পা বাড়ায়, বাসাবদলের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের সদর রাস্তায় এসে দাঁড়ায়-সেইসঙ্গে এই ইশারাটুকু রেখে যায় যে, পারিবারিক মতাদর্শের স্নেহমায়ার ব্যূহ থেকে বেরিয়ে না এলে শ্রেণীচ্যুতির সংকল্প সার্থক হয় না, সম্পূর্ণ হয় না গোত্রান্তর। রামু যখন তার সাধের ক্যালেন্ডারের ছবিটি ছিঁড়ে ফেলে, স্বপ্নদৃশ্যের বিমোহন থেকে মুক্ত করে নেয় নিজেকে, ঠিক তখনই দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। রানুদের ছেড়ে-যাওয়া বাড়ির দখল নিতে নতুন ভাড়াটে, এক দম্পতি, ট্যাক্সি থেকে নামে: তাদের কথাবার্তায় রামু শুনতে পায় তার আবাল্যলালিত আশা-আস্থার, মধ্যবিত্ত হিসেব-নিকেশের প্রতিধ্বনি। পুনঃসংঘটনের এই পদ্ধতির প্রয়োগ মেঘে ঢাকা তারা-র অন্তিম দৃশ্যেও আছে; ওই পুনঃসংঘটনই রামুকে বুঝিয়ে দেয়, অযুত-নিযুত নাগরিকদের মধ্যেই তার স্থান, কোনো গল্পই আসলে খাপছাড়া নয়। আর তার পর সেই আশ্চর্য বেহালাবাদককে ফের দেখা যায় পর্দায়: না চাইতেই সে রামুকে বাজনা শোনায়। মন্দাক্রান্তা তালে বাঁধা নিরন্তরতাবোধক ক্রিয়ার নিশ্চেষ্টতা ছেড়ে ঘটমান বর্তমানের বাস্তবতায় প্রবেশ করছে রামু। ইতিহাসপুরুষের আশীর্বাদ না পেলে কি তার নতুন জীবনের অভিষেকপর্ব সাঙ্গ হত? এর খানিক আগে রামু বলেছিল: 'আমরা সবাই মিলে নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছি। ব্যথার মধ্যে।' নাগরিক-এ-ঋত্বিকের পরবর্তী ছবিতে যেমন--'ব্যথা' কোনো বিশ্লেষণাত্মক একক নয়, শুধুই আবেগাত্মক, 'যন্ত্রণা'র শরীরী অভিব্যক্তি বা ঘটমানতার তীব্র প্রত্যক্ষতাও নেই। কিন্তু তাও অন্তত একটি ক্লোজ-আপের কথা না বললে অন্যায় হবে: বনেট-খোলা কালো একটা গাড়ি জানলা জুড়ে হাঁ হয়ে আছে, যেন, পাঁচিলের ঠিক ধারটাতেই মধ্যবিত্ত আঙিনার কোল-ঘেঁষেই চলছে সর্বগ্রাসের সর্বনাশের আয়োজন।

নাগরিক'-এর মূল প্রতিপাদ্যের আবেদন কাহিনীর বিন্যাসগত দুর্বলতাকে ছাপিয়ে ওঠে ঠিকই। ছবিটিতে কিন্তু প্রকরণগত পারিপাট্যের কিছু অভাব  রয়েছে। মেক-আপের বাড়াবাড়ি, কয়েকটি চরিত্রের চলচ্চিত্র-অসম্মত অভিনয়, কাঁচাহাতের ক্যামেরার কাজ- অধিকাংশ সময়েই স্টুডিওর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকার ফলে যা গতিহীনতার শিকার, দৃশ্যপট রচনায় কল্পনার অভাব, পীড়াদায়ক রেকর্ডিং, আগাগোড়া চড়া আলোর ব্যবহার-এইসব অসুবিধে সাধারণ একজন দর্শকেরই অস্বস্তির কারণ হয়। আর, চলচ্চিত্র আঙ্গিকের শিল্পবিশিষ্ট্য নিছক যান্ত্রিক এবং ব্যবহারিক খুঁটিনাটি এইসব কলাকৌশলের মধ্যেই তো সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রেমগুলির এক-একটির স্থিতিকাল, পারস্পরিক সান্নিধি-বিন্যাস-ধারাবাহিকতা-চলচ্চিত্রের পক্ষে এসবও তো ভীষণ জরুরী। আর, দৃশ্যনন্দনতত্ত্বের এই চাহিদাপূরণে সম্পাদকের দায়িত্ব যতটা, পরিচালকের দায়িত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। বোঝা যায়, এই ১৯৫২-য় ছবির ভাষা পুরো আয়ত্তে আসে নি তাঁর। মাঝেমধ্যেই নাটকীয় চালচলন মনে করিয়ে দেয় তাঁর হাতেখড়ি থিয়েটারেই। দৃশ্যসজ্জাও অনেক সময়েই প্রসেনিয়ম ষ্টেজেরই মতো। সংলাপের বহু অংশ এবং কয়েকটি চরিত্রের উপস্থাপনাও চলচ্চিত্র সম্মত নয়, যদিও যে-কোন নাটকে বেশ মানিয়ে যেত এদের। দুঃখের বিষয়, নায়ক রামু (সতীন্দ্র ভট্টাচার্য) কখনো-সখনো এবং সাগর (প্রতিনায়ক? অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত) প্রায় আগাগোড়াই এই দলে পড়ে। 

যদিও আবার একই সঙ্গে চলচ্চিত্রানুগ চরিত্রও পেয়ে যাই কয়েকটি। বিশেষ কয়েকজনের অসাধারণ অভিনয়ই হয়তো এর কারণ। ভোলা যায় না রামুর মাকে। তাঁর মনের ভিতরে ক্ষুদ্রতাবোধ, অসহায়ভাবে দুর্ভাগ্যের হাতে আত্মসমর্পণ, অজস্র অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, সুখের দিনগুলির স্মৃতি রোমন্থন, এইসব নিয়ে তিনি জীবন্ত হয়ে থাকেন। বিশেষ এই চরিত্রচিত্রণে প্রভাদেবী অসাধারণ। আর দুটি চরিত্র আমাদের মুগ্ধ করে-সীতা (শোভা সেন) এবং উমা (কেতকী দত্ত)।

চলচ্চিত্রগত মূল্য নিয়ে কয়েকটি মুহূর্তও গেঁথে যায় আমাদের মনে। ভারী সুন্দর সেই দৃশ্য যেখানে মা বলছেন তাঁর সুখের দিনগুলির কথা। দৃশ্যটির পরিকল্পনা অসাধারণ। ফাঁকা উঠোনের একদিকে উঁচু এক বারান্দায় খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে বলে চলেন রামুর মা-অনায়াস, অনাড়ম্বর অভিনয়ে বিষণ্ণ আবহাওয়া তৈরী করেন প্রভা দেবী। ভোলা যায় না রামুর বাবার মৃত্যুদৃশ্যটিও। ভাঙা গাড়ির কর্কশ আওয়াজ সেই ভয়াবহ পরিবেশকে ভয়াবহতর করে তোলে।  আর একটি অনায়াস জীবনধারার ছবি-তিন ভাই বোনের ছেলেমানুষি হুলস্থুল। উত্যক্ত হয়ে সীতা ডাকে তাদের মাকে। রান্না ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন মা 'কী হয়েছে?' রামুর দুষ্টুমি মাখা উত্তর 'আমরা....বাঁদরামি করছি!' 'হ্যাঁ তাই করো। পাশাপশি আরেকটি জিনিস আমার চোখে পড়েছে। নেপোটিজম শব্দটির প্রয়োগ। যদিও শব্দটি বহুল প্রচলিত ও পুরোনো, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে, মুম্বই ঘরানার সিনেমায় আবার যেন নতুন করে ফিরে এসেছে, নেপোটিজম এবং নেপোকিড শব্দদুটি। রামু প্রথমবার ইন্টারভিউ দেওয়ার পর প্রবল আত্মবিশ্বাসী ছিল চাকরিটা তার হয়েই যাবে। কিন্তু যখন শেষপর্যন্ত হলো না, তখন বোনের প্রশ্নের উত্তরে সে এই শব্দটি প্রয়োগ করে। কত আগে আমাদের জীবনে এই শব্দের ব্যাপক গুরুত্বের দিকটি তুলে ধরেছিলেন ঋত্বিক। আরেকটা দিক নাগরিক জীবনের , নজর এড়ায় না, সেটা হলো পাব্লিক ওয়ালে লেখা এখানে প্রস্বাব করিবেন না। আমরা আবাল্যকাল ধরে দেখে আসছি, চিরকালই খুব যত্নে দুষ্ট বালক বা ব্যক্তি এই " না" টাকে ক্রস (× )  দিয়ে কেটে দেয়। ঋত্বিকেরও চোখ এড়ায় নি এই ব্যাপারটা। ছোট ছোট ব্যাপার, কিন্তু সমকালীন সময়ে এই ঘটনাগুলো'যে অতীতের পদাঙ্ক অনুসারী, সেটাই যেন মনে হলো আবার।

সব মিলিয়ে পরিশেষে বলতেই হয়,  স্বাভাবিক ভাবে কিছু কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও, সেই সময়ের  প্রেক্ষিতে, ভবিষ্যতের অনন্য এক পরিচালক  তাঁর নিজস্ব ভাবনায়, উপলব্ধিতে নিজস্ব মৌলিক গতিপথের স্বাক্ষর রেখেছিলেন তাঁর প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি , নাগরিকে। তাকে অস্বীকার করা হলে, ইতিহাসের গুরুত্বকেও অস্বীকার করতে হয়।

                                                     

Sunday, January 18, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৬]



নাগরিকের কাহিনী ও বিস্তার 
............................................


ভাঙন ও অবক্ষয়ের মধ্যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার যে গতিটি 'নাগরিক'-এ বিধৃত, তা আমাদের স্পর্শ করে ঠিকই।

দীর্ঘদিন নিষ্ঠা সহকারে শিক্ষকতা করেছেন রামুর বাবা, তাঁর অবসরজীবনে গুরুতর আর্থিক সংকট। কদর্য সমাজব্যবস্থার অকৃতজ্ঞতায় ব্যথিত প্রৌঢ় মানুষটি পরিমণ্ডলের ওপর সমস্ত আস্থা হারিয়েছেন, আছে কেবল অবিমিশ্র নৈরাশ্য। চাকরী পাওয়া যে প্রায় লটারি জেতার সমান, এই কথায় জীবনযুদ্ধে অনভিজ্ঞ ছেলেকে তিনি কেবল নিরুৎসাহই করেন। অথচ যৌবনধর্মে আপ্লুত নায়ক রামু, সঙ্গী তার উদ্যম। বাবার নৈরাশ্য স্বভাবতই তার মনঃপূত নয়। নিজের খণ্ডিত উপলব্ধি আর আবেগের নিরিখে দুজনেই নিজেকে জাহির করে, ফলত উভয়ের মধ্যসৃষ্টি হয় ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।

অন্যদিকে, বিজ্ঞানের ছাত্র সাগর কাজ নিয়েছিল জাল ওষুধ তৈরির কারখানায়। নৈতিক বিচারে নিন্দনীয় এই জীবিকাই কিন্তু অর্থনৈতিক তাৎপর্যের গুরুত্বে সাগরকে দেয় বিশেষ সামাজিক মর্যাদা। পেয়িং গেষ্ট অনাত্মীয় এই যুবকটিই রামুদের সংসারে সম্মানের আসনটি দখল করে-রামু যে সম্মান থেকে বঞ্চিত, বেকারত্বের দায়ে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে তুচ্ছ রক্তের সম্পর্ক কিংবা নৈতিক বিচার।

অবক্ষয়কবলিত এই পরিবেশে নারী জীবনের দুর্দশার চার প্রতিনিধি-রামুর মা, বোন সীতা, প্রেমিকা উমা আর উমার বোন শেফালী।

অদূর-অতীতে আর্থিক স্বচ্ছলতার আস্বাদ পেয়েছিলেন রামুর মা, আজ যিনি সংসারের জোয়াল-কাঁধে ব্যতিব্যস্ত। অতীতের সুখস্মৃতি ঝাপসা হয়ে এলেও, তাকে আঁকড়ে রাখতে চান তিনি, নিষ্ঠুর বর্তমানকে সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।

মধ্যবিত্ত ঘরের আরো অনেক কুমারী মেয়ের মতোই তাঁর মেয়েটিকেও মেয়ে-দেখা নামক নিষ্ঠুর এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, আর বারবারই সহ্য করতে হয় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমান। বয়স বেড়েই চলে সীতার। ঘাটতি রূপের পসরায়, অভাব কাঞ্চনমূল্যের। হতাশা-বঞ্চনা-অপমান এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় সীতাকে, যখন সে নির্লজ্জের মতো আশ্রয় ভিক্ষা করে সাগরের কাছে, বিয়ের প্রস্তাবে। প্রেমের চেয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নই তখন জরুরী।উমার অবশ্য মর্যাদাহানিকর কোনে স্পষ্টভাষণের পথ নয়। কবে রামু চাকরী পেয়ে বিয়ে করবে তাকে, প্রতীক্ষায় যৌবন পার করে দেয়। তারও সংসারে অচল অবস্থা। বোন শেফালীর প্রায়-প্রকাশ্য গণিকাবৃত্তি, বাধা দিতে পারে না উমা-অর্থনৈতিক অনিবার্যতা। নিশ্চেষ্ট সে শুধু ভোগে মানসিক টানাপোড়েনে। ভাঙন রোধ করবে সক্রিয় প্রচেষ্টায়, এ-শক্তিও তার নেই। আছে শুধু দুর্বোধ্য এক নিস্পৃহভাব।অথচ শেফালী তো তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়েছে সচেতনভাবেই। সম্মানজনক কোন পেশায় নিযুক্ত হওয়ার মতো শিক্ষা বা ক্ষমতা তার নেই। নারীদেহটি মূলধন করেই পথে নামে সে-'খেতে হলে একটা কিছু করতে হবে তো।' হঠাৎ অল্প-পরিচিত এক পুরুষের ডাকে সে ঘর ছাড়ে বরাবরের মতোই।
-চারটি নারী, বস্তুত একই খাদক সংস্কৃতির চারটি শিকার।
আর এক বিকৃতি উমাদের নীচতলার এক কোণের ভাড়াটে যতীনবাবু। বেকার প্রৌঢ়। সাধ্য নেই, তবু সাধ রয়েছে প্রচুর। নানা ছুতোয় হাত পাতেন এর-তার কাছে। অথচ মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধও তাঁর প্রখর। সব পয়সাই 'ধার' নেন তিনি, 'শোধ' দিয়ে দেবেনই পরে কোন এক সময়ে!

রাজনৈতিক চেতনাবর্জিত, কূপমণ্ডুক এই চরিত্রগুলিকে তাদের বিবিধ দুর্বলতা নিয়ে উপস্থিত করে অবক্ষয়কবলিত, পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলেন ঋত্বিক। কোথাও তাকে সহনীয় করে তোলার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টাও তাঁর নেই। তবু, বিশেষ এক অসম্পূর্ণতাবশত ঘটনাটি হয়ে থাকে নিছক এক পরিবেশন (প্রেজেনটেনশান), কোন বিশ্লেষণের (এ্যানালিসিস) স্তরে পৌঁছয় না।

প্রত্যেক সামাজিক প্রক্রিয়ার মতো অবক্ষয় নামক এই ক্রমবর্ধমানব্যাধিটির পিছনেও যে আছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির ঘাতপ্রতিঘাত, সেগুলির উল্লেখ অস্পষ্ট বড়ো, সরাসরি পাদপ্রদীপের আলোয় তাদের নিয়ে আসেন নি ঋত্বিক। রামুদের অর্থনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিক অধোগতি-ভদ্রাসন বিক্রী করে তথাকথিত ভদ্রপাড়ায় ছোট বাসা ভাড়া নেওয়া, তারপর সেখান থেকেও চলে গিয়ে বস্তীবাড়িতে ওঠা-এর মধ্য দিয়ে ক্রমব্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংকটের মোটামুটি একটি পরিপ্রেক্ষিত আসে বটে। কিন্তু এতেই কি স্পষ্ট হয় যে সামাজিক প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল? 

এ ছবির শুরু বলিষ্ঠ এক পুরুষমূর্তির ঘর্মাক্ত কলেবর দেখিয়ে; অনবরত হাতুড়ি চালিয়ে চলেছে সে। ছবির শেষ হয় ওই একই প্রতীকের পুনরাবৃত্তিতে। ইতিমধ্যে ছবির নায়কের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমাদের, বোঝা গেছে পুরুষ মূর্তিটি এল রামুরই প্রতীক হয়ে, প্রতিকূল পরিবেশে অদম্য প্রত্যয়ই যার পাথেয়। মধ্যবর্তী আবর্তনের চক্রে ঘুরে  ফিরেই আসে প্রত্যয়ের দীপ্ত প্রকাশ। সুরটি অবশ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই রকম চড়াপর্দায় বাঁধা। রামু বারবার চিৎকার করে জানায় 'আমি মানি না, মানব না'। বৃদ্ধ বেহালাবাদকের তোলা অচেনা অথচ উদ্দীপনাময় এক সুর তার তন্ত্রীতে জাগায় অনুরণন, জোগায় অনুপ্রেরণা। প্রত্যয়ের সুর বাজে ছবিতে 'আন্তর্জাতিক'-এর একাধিক প্রয়োগে।

লক্ষণীয় রামুর উচ্চকণ্ঠ, বেহালার তান, 'আন্তর্জাতিক'-এর ছন্দ-ঘটনাবলীর সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র খুবই অস্পষ্ট। তবু নাটকীয়ভাবে এদের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আসলে প্রত্যয়ের এহেন অভিব্যক্তি, তার প্রতীকী ও ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ-এসবের মধ্য দিয়ে ঋত্বিক উদঘাটন করেন কেবল মধ্যবিত্তসুলভ রোম্যান্টিসিজম। সম্পূর্ণ আবেগনির্ভর এই মানসিকতার উৎস সন্ধানে যাওয়া বৃথা। কোন কোন শক্তি একে পুষ্ট করে, রক্ষা করে, সদুত্তর মিলবে না ও প্রশ্নেরও অথচ একেই ঋত্বিক ব্যবহার করতে চান পার্থিব কষ্টমোচনের হাতিয়ার হিসেবে।

রামুর বন্ধু সুশান্তর চরিত্রও এই প্রত্যয়ের আর-এক দিক। কিন্তু উপস্থাপনার দোষে চরিত্রটি বিকশিত হয় নি পুরোপুরি। এটুকুই কেবল জানা যায় যে, স্থানীয় শ্রমিক-আন্দোলনের সে অন্যতম পুরোধা। মধ্যবিত্ত রোম্যান্টিসিজমের প্রতিতুলনায় সুশান্তর সংগ্রামী মানসিকতাকে যদি রাখতেন, পরবর্তী অসুবিধের হাত থেকে হয়তো রেহাই পেতেন ঋত্বিক।



Thursday, January 15, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৫]


মন্দাক্রান্তা 



নাগরিক সিনেমাটিকে নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে কিছু তথ্য দিয়ে দিই ---

{ নাগরিক

প্রযোজনা: ফিল্ম গিল্ড, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিক ঘটক

কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ঋত্বিককুমার ঘটক

আলোকচিত্র: রামানন্দ সেনগুপ্ত

সম্পাদনা: রমেশ যোশী

সঙ্গীত: হরিপ্রসন্ন দাস

ধারাভাষ্য: ঋত্বিককুমার ঘটক

অভিনয়: প্রভা দেবী, শোভা সেন, কেতকী চ্যাটার্জি, গীতা সোম, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য, অজিত ব্যানার্জি, কালী ব্যানার্জি, কেষ্ট মুখার্জি, গঙ্গাপদ বসু, শ্রীমান পিন্টু, পারিজাত বোস, মমতাজ আহমেদ খান,  অনিল চট্টোপাধ্যায়, উমানাথ ভট্টাচার্য, অনিল ঘোষ, কানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

মুক্তির তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭

প্রেক্ষাগৃহ: নিউ এম্পায়ার }


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তজীবনের ভাঙনের ছবি 'নাগরিক'। মুখ্য হলেও, এ ছবির সামগ্রিক পরিচয় কিন্তু এটাই নয়। উপেক্ষা করা যায় না ছবির গৌণ দিকটিকেও-বর্তমানের ভয়াবহতাকে স্বীকার করার পরও সমস্ত ছবিটি জুড়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুর্নিবার এক প্রত্যয়ের সুর। আলংকারিক অর্থে তো বটেই, আক্ষরিক অর্থেও। বিপ্রতীপ এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব মুহুর্মুহু দর্শকের চেতনায় আঘাত করে তাকে সচেতন থাকতে বাধ্য করে।

মা বাবা দুই ছেলে এক মেয়ে-এই পাঁচজনকে নিয়ে নাগরিক-এর পরিবার। এরা পূর্ববাংলা থেকে আগত উদ্বান্ত নয়; না হলেও, শিক্ষকতা থেকে বাবা সুরেশ বাগচী অবসর নিলে, শ্যামপুকুরের বড়ো বাড়ি ছেড়ে তাদের উঠে আসতে হয়েছে কলকাতার এক ঘিঞ্জি পাড়ায়, চার পাশ চাপা স্যাঁতসেতে একটা বাড়িতে। বড়ো ছেলে রাম্ সাবালক হলেও স্বাবলম্বী নয়, এখনও বেকার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ডামাডোলে চাকরি জোটানো মুখের কথা নয়। বাবার পেনশনটুকুই পরিবারের ভরসা-ওই যৎসামান্য আয়ে কায়ক্লেশে গ্রাসাচ্ছাদন যদিও বা হয়, সুস্থভাবে বেঁচে জীবনটাকে আরেকটু বর্ণময়, উপভোগ্য করে তোলা অসম্ভব। সৎ আদর্শবাদী পিতা জীবনের প্রান্তে বসে ভাবেন, এ আমরা কোথায় এলাম: 'আমাদের বাংলা ছিল গড়া বাংলা। আজকের বাংলা হচ্ছে ভাঙা বাংলা।... একটা পুরোনো দালানের মতো দেশটা ভেঙে পড়ছে।'

 হেঁশেল ঠেলে ঘরদোর সামলিয়ে মা'র দিন যায়; ফেলে-আসা বাড়ির জন্যে আক্ষেপ তাঁর ঘোচবার নয়: 'বাড়িটা যেন হাড়েপাঁজরায় মিশে আছে।' হাঁপ-ধরা সংকীর্ণ পরিবেশে মা'র মতো রামুর মনও ঘুলিয়ে ওঠে, মুক্তির স্বপ্ন দেখে সে। সেই-স্বপ্নের বিশ্বাস্য চিত্ররূপ সে খুঁজে পেয়েছে নোনা-ধরা দেয়ালে টাঙানো পুরোনো একটা ক্যালেন্ডারের ছবিতে: তাতে আঁকা, দিগন্তলীন মাঠের মাঝখানে একখানা লাল টালির বাংলো। রামু নিত্য নিজেকে স্তোক জোগায়, আর কয়েকদিনের ভেতরেই সে চাকরি পাবে-পেলেই, প্রেমিকা উমাকে বিয়ে করে অমনই এক খোলামেলা জায়গায় ঘর পাতবে দুজনে; রূপকথার শেষে যেমন হয়, 'অতঃপর তাঁহারা সুখে-শান্তিতে রাজত্ব করিতে লাগিলেন', তেমনিভাবে 'করিতে লাগিলেন'-এর মতো নিরন্তরতাবোধক স্বস্তিদায়ক যৌগিক ক্রিয়ার আবেষ্টনে গুছিয়ে নেবে সাধের সংসার। রামুর এই সুখকল্পনা সম্পর্কে নাগরিক-এর প্রচারপুস্তিকায় ঋত্বিক লিখেছিলেন: 'রামুর। চোখে স্বপ্ন... একটি নীড় বেঁধে উমার সঙ্গে তার দিন কাটবে মন্দাক্রান্ত তালে।"

'মন্দাক্রান্তা': শব্দটি নাগরিকের সঙ্গে 'মেঘদূত'-এর, রামুর সঙ্গে ঋত্বিকের অন্যান্য যক্ষসদৃশ নায়কদের আত্মীয়বন্ধন নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয়। ১৯৪৭-এ প্রকাশিত 'এক্সট্যাসি' গল্পের ক্লান্ত তিক্ত প্রাক্তন দেশকর্মী, মধ্যপ্রদেশের জংলা রুক্ষ প্রকৃতি আর গভীর নীল আকাশের কাছাকাছি পালিয়ে যায়; নির্জন প্রান্তরে শুয়ে-বসে ধীরে-সুস্থে বাকি কটা দিন কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার। সে ভাবে: 'না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরা, কিছু না বুঝে ছুরি খেয়ে শেষ হওয়া, বীভৎসতা আর দৈনন্দিন জীবনের শত-সহস্র বেদনা, এবং তারই পাশে ধনিকের টাকার জোরে সমগ্র শাসন-যন্ত্রটাকে হাতে ক'রে উল্লসিত উদ্দাম পৈশাচিকতা, এর বিরুদ্ধে আমি কি করতে পারি?... তার চেয়ে এই ভালো।...কি ভালো যে লাগছে, বলতে পারি না। এ সেই কালিদাসের মেঘদূতের দেশ, আমাদের অলকার দেশ।' যদিও সে জানে বনে-বনান্তরে যে রস ক্ষরিত হচ্ছে তাতে  লীন হলে পাগল হয়ে যাবে তবু ওখানেই রয়ে যেতে বদ্ধপরিকর সে। তার যাই হোক, একসময় কি রামুর অসহ্য লাগবে না ও-আত্মরতি, 'আকাশগঙ্গার স্রোত ধরে' গল্পের নায়কের মতন তাকেও কি শুনতে হবে না কথকের সেই ধিক্কার: 'গর্দভ।'



ছবিঋন: গুগল


Sunday, January 4, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা |প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৪]


ইতিহাসের হাত ধরে 
.................................

একজন সাতাশ বছরের যুবক প্রথম যে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন, তার নাম নাগরিক। সাল ১৯৫২। ঠিক সাতাশ বছর আগে, ১৯২৫ সালের ৪ ঠা নভেম্বর ঋত্বিকের জন্ম, বাংলাদেশের রাজশাহী শহরের মিঞা পাড়ায়। এ বছরেই ২৭ বছর বয়সে সের্গেই আইজেনস্টাইন নির্মাণ করছেন ১৯০৫ সালে রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনের ক্রুরাতাদের অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় সংঘটিত বিদ্রোহের একটি নাটকীয় চিত্রায়ণ। যে ধ্রুপদী ছবিটি ঋত্বিকের সমবয়সী। তাই হয়তো ওডেসা সিঁড়ির বৃত্তান্তের মতোই তাঁরও জীবনবৃত্তান্তে রক্ত ও স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

১৯৫২ সালে গোটা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়,কিকুয়ু উপজাতির নেতা জোমো কেনিয়াট্টা কেনিয়া থেকে শ্বেতাঙ্গ বিতাড়নের জন্য মাউ মাউদের সংগঠিত করলে ব্রিটেন মাউ মাউ দমনের জন্য সৈন্য পাঠায়।  আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী রচনা করেন এই বছরেই। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়। বাঙালি জীবনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ। ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউরসহ কয়েকজন শহীদ হন। এই ঘটনাটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। 
পাশাপশি বাংলা চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই বছরেই " বসু পরিবার" সিনেমার হাত ধরে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন সুপ্রিয়া দেবী। যিনি ঠিক আট বছর পর, ঋত্বিকের প্রিয় ও প্রধান নারী চরিত্র, নীতা হয়ে, মেঘে ঢাকা তারার মতো কাল্ট ফিল্মের মাধ্যমে নিজের অভিনয় প্রতিভাকে  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটের হাত ধরেই চলে আসি, ঋত্বিকের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, নাগরিকে।




Sunday, December 28, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৩]


কাঁটাতার ও দেশভাগ
...................................


ওপরের প্রেক্ষাপটটি এই ছবি তৈরির নেপথ্য সত্য হলেও এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলে, ঋত্বিক কুমার ঘটকের প্রথম তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা " নাগরিক" নিয়ে আমার অনুভূতি ও ভাবনা চিন্তার কথা আলোচনা করবো। 

মানুষের অবয়বে মানুষ হাঁটছে। মানুষের প্রথম চলার ইতিহাস আনুমানিক, অর্থাৎ মানুষের চেতনঋদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস অনেকটা প্রচারনির্ভর। সেখানে বিভিন্ন সময়ের সেলিব্রিটিদের ভিড়। রাজা রাজড়া আমির ওমরাহ বাদশাহ নবাব সম্রাট প্রভূত রহিস ব্যক্তিত্বের ভিড়। ইতিহাসের চোখ, আইনের ন্যায়দণ্ড হাতে দাঁড়ানো চোখবাঁধা চরিত্রটির মতো অসহায়। কালো কাপড় যেন প্রতীকী। অনেকটা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে 
 না'র মতো। ইতিহাস তাঁদেরই গুরুত্ব দেয়, যারা সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে প্রচারের লাইম লাইটে ওপরের সারিতে এসে দাঁড়ায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হয়ে কলম ধরেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক শিল্পী ঔপন্যাসিক চলচ্চিত্র পরিচালক। কিন্তু কেউই  ঋত্বিক ঘটকের মতো সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে , রাজনৈতিক দুরূহ অভিসন্ধির শিকার 
 স্বাধীনোওর এই একাগ্র বাংলার বিক্ষত দেশ হারানো হাজার লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের রাতারাতি জীবনের গূঢ় শিকড় ছেঁড়া আর্তনাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি। আবেগপ্রবণ অত্যন্ত সংবেদনশীল সৎ ও ঋজু  মানুষটির সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে বাঙালির অস্মিতা এবং গহন সংস্কৃতির ঐতিহ্য যা একান্তই দেশজ, যা কৃত্রিম শিক্ষার ড্রয়িংরুমে সাজানো বিলাসবহুল চর্যার নিরক্ত করবীর অন্তঃসারশূন্য বিলাপ নয়। এরফলে নানাবিধ বাহ্য প্রলোভন ও সামাজিক সাফল্যের সুযোগ পেয়েও তিনি স্বজাতির হাত কখনোই ছাড়েন নি।

তিনি সিনেমাকে কেবল নিছক বিনোদন, আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তির উপায় কিংবা ধনী রাষ্ট্রে নিজেদের বিপন্ন বিস্ময় আর দারিদ্র্য বেচার কৌশল মনে করেন নি। প্রথম থেকেই তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনার মূল কাঠামো বা ফোকাস একই ছিল, কিন্তু নিজের involvement বা ভাবনার সঙ্গে নিজের সমস্তটাকে এমন ভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন যে জীবনে এসেছে চরম বিড়ম্বনা এবং বিশৃঙ্খল ভাঙনের ক্ষয়। একদিকে চেনা মানুষের বা নিজের  রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে, যে সমস্ত দলীয় সহকর্মী দলের কাছের দূরের  চেনা মুখগুলো, একটু একটু করে পাথুরে মুখোশে বদলে গিয়েছিল, বৃহত্তর স্বার্থকে উপেক্ষা করে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে চরিতার্থ করার অদম্য বাসনায়। তারাই বিশেষ করে ঋত্বিকের স্বপ্নে, ভাবনায়, দেশভাগের কাঁটাতারের চেয়েও আরও গভীর যন্ত্রণায় বুকে বিঁধে গিয়েছিল।রাজনৈতিক দৃঢ় বিশ্বাসে যে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন, ছিন্নমূল মানুষের যে আশা যে গণচেতনা ও গণসংহতি, একক ভাবে বিছিন্ন না হয়ে সামগ্রিক শক্তির উত্থানের কথা ভাবতেন ঋত্বিক, স্বপ্ন দেখতেন নারীর অপরাজেয় শক্তির, নারীর কমনীয়তা সহিষ্ণুতা এবং প্রয়োজনে চূড়ান্ত লড়াকু, একদিকে মা,অন্যদিকে বিক্ষত আপনের ক্ষতের প্রলেপ ভেবে ,এই সর্বংসহা অথচ অনমনীয় নারীর লড়াইয়ে যে মুক্তি তাও যখন বিপন্ন সময় ও বদলে যাওয়া লোভী মানুষের সমীকরণে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছিল সুদৃঢ় শিকড়ের প্রত্যয়, তখন সেই আঘাতের তীব্রতা আজীবন আর সহ্য করতে পারেন নি ঋত্বিক। ভেঙে গিয়েছিল মর্মন্তুদ যন্ত্রণায় তাঁর শরীর, মন, তাঁর আশা স্বপ্ন সবকিছু। তবুও নিবিড়ে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, এবং অশোষহীন লড়াইয়ের অঙ্গার,জীবনপণ করে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে। তারাই ছিলো তাঁর ভাবনার কথক, তাঁর নিজস্ব লড়াইয়ের সুপ্ত বারুদ। একদিকে ক্রমশ একা হয়ে পড়া,  আদর্শবাদী একজন প্রখর ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে লোভী, চূড়ান্ত স্বার্থপর দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের অগণনীয় ভণ্ড মানুষের স্খলিত বিবেক তাঁকে অভিমানী করে তুলেছিল। সমস্ত ব্যাপারেই মেনে নেওয়া। শুধুই আপোষ। ভেড়ার পালের মতো অন্ধ অনুগামী এক অনড় সিস্টেম। বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো এ কারণেই ক্রমশ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়।  আপাতভাবে যে মানুষটা একদিন মারা গিয়েছিলেন, তার  প্রস্তুতি চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জীবনভর দেশভাগের যন্ত্রণা ও বাঙালির স্বখাত সলিলে নিমজ্জিত হবার শিকড় চ্যুতি তাঁর চিরকালীন প্রতিবাদ হয়েই রইলো!


Sunday, December 21, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ২]


প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট 
..............................

মেঘে ঢাকা তারা,কোমলগান্ধার,সুবর্ণরেখা এই দেশভাগত্রয়ীর বেশ আগে ১৯৫১-৫২য় ঋত্বিকের হাতেখড়ি নাগরিক তাঁর প্রথম ছবি, আধুনিক বাংলার দুর্যোগ বিষয়ে প্রথম বিবৃতি। প্রসঙ্গের ঐক্য সত্ত্বেও আঙ্গিকের বিচারে নাগরিক-এর সঙ্গে পরের তিনটি ছবির পার্থক্য অনেক। তা-ও আখ্যানবস্তু আর আখ্যানযুক্তির যে-সংশ্লেষ ঋত্বিক একদিন ঘটাবেন, তার কয়েকটি আগাম লক্ষণ নাগরিক-এ আছে: আর কিছু না হোক, গোড়াপত্তনের ধরন থেকে পরবর্তী বিকাশের আঁচ নিশ্চয়ই মেলে।


১৯৫০ সালে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে ঋত্বিক যুক্ত হন চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তবে 'সিনেমা' সম্পর্কে আগ্রহের সূচনা কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিলগ্নের দিনগুলোতে। ঋত্বিকের মেজদা 'নিউ থিয়েটার্সে'র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্যামেরাম্যান হিসেবে, স্ট্রিট সিঙ্গার ছবিতেও তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁরই সুবাদে প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে বিমল রায় পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতের অনেকেরই তাঁদের বাড়িতে আসাযাওয়া ছিল। এঁদের আড্ডা; ছবি নিয়ে আলোচনা কিশোর ঋত্বিককে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো, তবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করার কোন সচেতন ভাবনা তখনো মনে জাগেনি।

চলচ্চিত্রকার ঋত্বিকের জীবন শুরু হয় বিমল রায়ের কাছে-তাঁর ছবির মুখ্য সহকারী ও কাহিনীকার হিসেবে। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর আত্মপ্রকাশ কিন্তু ১৯৫১ থেকে ৫২ সালের মধ্যে নির্মিত বেদেনী। অরূপকথা ছবিতে। এখানে তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। ছবিটি অবশ্য নানাকারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর পর একে একে সৃষ্ট হয় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বহনকারী অনবদ্য ছবিগুলো, যদিও সমসময়ে তা ঋত্বিককে বিশেষ কোন সাফল্যের মুখ দেখাতে পারেনি। আমাদের দুর্ভাগা দেশে চলচ্চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাও এর একটা বড় কারণ। ঋত্বিক তাঁর মননে মেধায় সময়ের থেকে অনেক এগিয়েছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। যাই হোক মুখে তিনি যতই বলুন না যে চলচ্চিত্র প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে তাঁর কাছে অপরিহার্য বা শ্রেষ্ঠতম নয় তবু আমৃত্যু চলচ্চিত্রকে তিনি ছেড়ে যেতে পারেননি। "ছবি না করে তো বাঁচতে পারি না.... কাজেই এই ছবিই করি, আর কিছু না।"

ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি তাকিয়েছেন মানুষের দিকেই-"তাৎক্ষণিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কোনদিকে যাচ্ছে সেটার দিকে তাকাই এবং টু দি বেস্ট অব মাই এবিলিটি সেটা আমি বলার চেষ্টা করি।"

পরের ছবি নাগরিক (১৯৫২-৫৩)-কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ঋত্বিককুমার ঘটক। যে ফিল্ম গিল্ডের ব্যানারে ছবিটি তৈরি হয়েছিল, তার তিনজন সংগঠক ছিলেন-প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিককুমার ঘটক। এই দুজনই ঋত্বিকের প্রতি গভীর ভালবাসা ও অন্তরের টানেই এগিয়ে এসেছিলেন। বাড়ী মর্টগেজ রেখে টাকা দিয়েছিলেন ভূপতি নন্দী। এঁরা ছাড়াও দারোয়ান, ছুতোর কেষ্ট রায়, বহু সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। কারণ-"সমস্ত থিমটাই ছিল বাস্তবজীবনের সুখেদুঃখে গাঁথা। তাই নাগরিক হয়ে ওঠে পিপলস্ আর্ট" (দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)।

ভূপতি নন্দীর সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের আলাপ মৃণাল সেনের মাধ্যমে ১৯৪৮-৪৯ সালে। এই আলাপ ক্রমে প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।-"ক্রমে ক্রমে দেখলাম যে মৃণালের চেয়েও ঋত্বিকের উপর আমার আস্থা বাড়ছে।... গণনাট্য সঙ্ঘের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে ঋত্বিকের শিল্পগত সৃষ্টির ধ্যানধারণা এবং স্বপ্নের অনেক মিল আমি খুঁজে পেলাম,... বক্তব্য যদি কবিতার মাধ্যমে, গানের মাধ্যমে, নাটকের মাধ্যমে বা আরো নানা মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়; তবে সেটা সেভাবেই ত ব্যবহার করা উচিত -এই কথাই ঋত্বিক মাঝে মাঝে আমাকে বলত,... অর্থাৎ ফিল্ম সম্বন্ধে ঋত্বিকের এই মুক্ত মন আমাকে চমৎকৃত করেছিল।"

ঋত্বিক যখন নাগরিক করার কথা ভাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই ভূপতি নন্দী এগিয়ে এসেছিলেন-অর্থের লোভে নয়, সম্পূর্ণ আদর্শের টানে। যে টাকা তিনি দিয়েছিলেন তা তিনি ফেরৎ পাননি কোনদিন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশও করেননি। ক্ষোভ একটাই যে অতি সামান্য কারণে, হয়তো কোন সামান্য ভুলের জন্য ছবিটা মুক্তিলাভ করেনি এবং বাক্সবন্দী থেকেই সেটা নষ্ট হয়ে গেল। নির্দ্বিধায় তিনি একথাও বলেছেন-"আমার এইটুকুই আনন্দ যে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিতান্তই ঘটনাচক্রে আমার নাম জড়িত হয়ে পড়েছে।” এই ঘটনাগুলো আমাদের অন্তত এটুকু বুঝতে সাহায্য করে যে ঋত্বিকের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আদর্শের দৃঢ়তা, সৎ ও স্বার্থনিরপেক্ষ চিন্তা ছবির বাইরের মানুষকেও এভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে, আকর্ষণ করেছে।

পরিচালকের জীবদ্দশায় এ-ছবি মুক্তিলাভ করেনি। জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সম্পূর্ণ এই ছবি তাঁর মৃত্যুর দেড় বছর পরে ১৯৭৭ সালে কলকাতার, দর্শক দেখতে পান। ততদিনে ছবিটিও সম্যক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃতপ্রায়।  শ্রী ব্রম্ভা সিং ও শ্রী রমেশ যোশী ফিল্মটির একটি প্রিন্ট উদ্ধার করেন বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরি থেকে। মূল নেগেটিভটি হারিয়ে গেছে। সময়ের ক্ষতচিহ্ন (এই প্রিন্টটা ১৯৫৩য় করা গুটিকতকের একটি) ছিল এর সর্বাঙ্গেই প্রায়। পুনা এন. এফ. এ. আই-এর কিউরেটর শ্রী পি. কে. নায়ার ছবিটির প্রিন্ট এবং একটি ডুপলিকেট নেগেটিভ তৈরি করেন ১৯৭৭ সনে। ছবিটি ২৫ বছর পরে মুক্তি পায়। তবে ১৯৫৩ সাল নাগাদ হাওড়া জেলার একটি মফস্বল প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি কয়েকদিন চলে এবং আইনগত কারণে প্রদর্শন বন্ধও হয়ে যায়।)



Tuesday, December 16, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ১]



(বিশেষ দ্রষ্টব্য --- সমকালীন সময়ের নিরিখে দাঁড়িয়ে, শ্রদ্ধেয় ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে এবং তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত এবং মুক্তিপ্রাপ্ত নয় এমন চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, নাটক, ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের আনখশিখর অস্তিত্ব নিয়েই আমরা সংকটে পড়ি। উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদেরই ওপরে বর্তায় এই দায়। কারণ জীবিতঅবস্থায় আমরা ঋত্বিকের গভীর উপলব্ধি, দর্শন যেমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিয়েছি, ভয়ে ও স্বভাব দোষে, যার ফলশ্রুতি  ধীরে ধীরে আত্মধ্বংসের প্রস্তুতি যার মূলে অনেকাংশে আমরাই দায়ী, তাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা আজ আর নেই। তাঁর জীবন ও মৃত্যু দুটো অর্ধ শতাব্দীর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশ বছরের স্বল্প জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে দেশভাগ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ে যে ক্ষয় ও পচন তা তাঁকে ভাবিয়েছে, তীব্র কষ্ট দিয়েছে। 
নীলকন্ঠের মতো একাই সেই গরল পান করে ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হয়েছেন। নানাকরণবশত তাঁর প্রথম ছবি থেকে শেষ ছবি পর্যন্ত অনেক ছবিই ঠিক সময়ে মুক্তি পায় নি। তিনি অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত, অস্থিরচিত্ত, প্রথাভাঙা, অনুশাসনহীন, প্রতিবাদী, গড্ডলস্রোতে গা না ভাসানো, আনুগত্যকে তীব্র ভাবে অস্বীকার করেন বলেই বারংবার আমাদের তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজের ভন্ডামি তাঁকে ব্যঙ্গ করেছে। কোনোও দিক থেকেই পেরে ওঠেনি বলেই, তাঁর জীবনে নানারকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাঁর ক্ষমতাকে লঘু চোখে দেখে, এই শিক্ষিত হামবাগ বোনলেস চলচ্চিত্র সমালোচক, সমকালীন প্রভাবশালী পরিচালক বন্ধুরাও তাঁর পিঠে বারংবার ছুরি মারতে দ্বিধাবোধ করেনি। আর আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়ে, অনেক স্মৃতি রোমন্থন, তাঁর ছবি দেখিয়ে, বই প্রকাশ করে, যে পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমরা করে চলেছি, তাতে একটুও আমাদের দূষিত কর্মফলের ভার কমে না। আমরা সেই বাঙালি আজও, যারা মৃত্যুর পর শ্রদ্ধেয় গুণীর চিতার পাশে সমাধিফলক রচনা করে, বড়ো বড়ো বাতেলা দিয়ে কাঁদুনি গাই, কিন্তু আমরাই জীবিত অবস্থায়, দিনের পর দিন, পরিকল্পিত চক্রান্তের মধ্য দিয়ে, সেইসব গুণীদের কোণঠাসা করি। তাঁর সবকিছু আশা স্বপ্নকে পিষে, দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে আত্মিক শান্তি পাই। স্রষ্টা ঋত্বিক, দ্রষ্টা ঋত্বিক এই বাঙালিদের হাড়ে হাড়ে  চিনতেন। এরফলে তাঁর সামনে কোনোও বঙ্গজ আঁতেল  সিনেমা নিয়ে বড়ো বড়ো কথা বললে, নিজের স্বকীয় ভাষার আভিজাত্যে তাদের প্রতিআক্রমণে দিশেহারা করে দিতেন। তিনি মনেপ্রাণে সাধারণ মানুষকে ভালবাসতেন, তাদের কথা ভেবেই ছবি করতেন এবং নিজের এই কমিটমেন্ট থেকে আমৃত্যু কখনোই সরে আসেন নি। হাজার প্রলোভনকে উপেক্ষা করেছেন। নিজের সৃষ্টির সততা এবং যাপনকে কখনোই আলাদা করেন নি। 
তাই ঋত্বিকের ছবির ক্যামেরা ও সম্পাদনা , তাঁর বিষয়ভাবনা, সিনেমার সঙ্গীতের প্রয়োগ যে গভীর বোধ ও চেতনঋদ্ধ অসীমতাকে তুলে ধরে, তাতে কেবল আমরা বিস্মিতই হই না, আমাদের বিবেক - বোধ - চেতনাকে এমনভাবে আঘাত করে, জাগ্রত করে, যে সেই অমোঘ নিষ্ঠুরতা আমাদের মনেই প্রতিপ্রশ্ন জাগায় জীবনানন্দের মতো -- 
"মধ্যবিত্তমদির জগতে আমরা/ বেদনাহীন-অন্তহীন বেদনার পথে।/ কিছু নেই- তবু এই জের টেনে খেলি; / সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হ'লে হাসি;/জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে-অন্ধকারে-/মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।/তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ'য়ে /আমরা কি তিমিরবিলাসী? / আমরা তো তিমিরবিনাশী হ'তে চাই।/ আমরা তো তিমিরবিনাশী।" )

আজকের বিষয় , 

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্যে 

 ঋত্বিক ঘটকের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াচিত্র
                         "নাগরিক"


কালপুরুষ 
..................

রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতির ভূমিকায় বলেছেন- "স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যাহা কিছু ঘটিতেছে, তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি অনুসারে কত কী বাদ দেয় কত কী যে রাখে।... জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে- তাহা কোন এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা।"-

বিভূতিভূষণের প্রায় সব লেখাতেই 'কালপুরুষের' প্রসঙ্গ আছে। ভারতীয় দর্শনে, উপনিষদে আছে যে কালপুরুষ যাকে ভর করে সে ঘরছাড়া হয়ে যায়, ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, কোথাও বাসা বাঁধতে পারে না। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই বিবাগী মানুষটি হলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। আপসহীন , ঋজু এই মানুষটির জীবনদর্শন ও ভাবনায় যে নিরবচ্ছিন্ন নিরঙ্কুশ সততা এবং ভাবনার দেশজ শিকড়ের অতলান্ত আহ্বান, তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে বারংবার। সমস্ত জীবনভর এক অদৃশ্য শক্তি তাঁকে চালনা করেছে। এক অদৃশ্য স্রষ্টা তাঁকে দিয়ে এমন সব কাজের ইন্ধন জুগিয়েছে যে আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে দাবানল আজ জ্বলার কথা, তা স্ফুলিঙ্গেই আত্মঘাতী হয়েছে। আসলে, ঋত্বিকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব বাঙালী-মানসকে আন্দোলিত করেছে প্রবলভাবে। গড্ডল প্রবাহে অভ্যস্ত আমাদের জীবনকে একদিন শিকড় ধরে নাড়া দিয়ে নতুন জীবনের বার্তা শুনিয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। স্বভাবে বোহেমিয়ানা প্রতিভার বিপুল স্ফুরণকে ক্ষণস্থায়ী করলেও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করল এক 'অন্য ধারা'।



গ্রীক পুরাকাহিনীর নায়ক প্রমিথ্যুসের মতোই নিজ জীবনে অসহ্য যন্ত্রণা বরণ করে নিয়েই গৌড়জনের জন্য মধুসূদন যে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ উপহার দিয়ে গেলেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋত্বিককুমার ঘটক সেই আগুনের সফল উত্তরাধিকারী। অথচ এই ত্রয়ীর অভ্যন্তরীণ মিলনবিন্দুকে আজও কী আমরা সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি?

Saturday, September 13, 2025

কবিতার ডালপালা | অরিজিৎ চক্রবর্তী

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||

কবির সামাজিক ভূমিকা / অরিজিৎ চক্রবর্তী


পরিচিত বস্তুবিশ্ব বিশেষ করে জীববিশ্ব থেকে মানুষের নিত্যদিনের গল্পগুলি তাদের কুশীলব বেছে নেয়। পৌর্বাপর্যের ঢাল বরাবর কালপট বেয়ে এরা ধাবমান। অনুকৃতির আদর্শ মেনে কর্মরত কবি, এদের কান্না হাসির জটলা থেকে বেছে নেন প্রজনন-ক্ষম একটি অন্তঃসত্ত্বা মুহূর্ত! আমরা যারা পড়ছি এবং দেখছি আত্মীয়তা এবং শখ‍্যের দাবি মেনে নৈকট্যের একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে এদের সঙ্গে। অর্থাৎ অন্ধের বর্ণের মতো শব্দের আইকনোগ্ৰাফি আমাদের জানিয়ে দেয়,"মাটি থেকে গন্ধ ওঠে, গন্ধ মাখা রুটি / খেয়ে চলে হেতু আর অহেতু প্রকৃতি।"প্রসিদ্ধ জীববিজ্ঞানী ত‍্যেলর দ‍্য সাঁদা ( Teilhard de Chardin ) Phenomenon of Man গ্ৰন্থে Biosphere এর সঙ্গে Noosphere যোগ করেছেন। কবি রাহুল পুরকায়স্থ 'হেতু' আর 'অহেতু'-র Creative imagination -এ প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষ উন্মিলীতাায় জানিয়ে দিলেন গাছ বাঁচলে মানুষ বাঁচে।

সবচেয়ে মুগ্ধ হই যখন দেখি স্হান ও কালের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া একটা ইচ্ছাকৃত বন্ধনমুক্ত রেখাহীন অস্পষ্টতা,যার আপাত কল্পলোকের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক স্পষ্ট জীবনবোধ‍্যতা, আমাকে আনত হতে বাধ্য করে।

"আহতকে প্রাণ
আমার জীবন আজও

উড়ন্ত বৃক্ষের
আজান আজান"

ক্লোরোফিলের শব্দরজ্ঞক নিয়ে কবি উড়ন্ত বৃক্ষের আজান ধ্বনির সম্প্রীতির উপনিষদ গড়ে তুললেন।সব রূপের অনিত‍্যতা যেমন স্পষ্ট হলো, তেমনি তাদের মূল ঐক‍্য ' বর্ণান্ অনেকান্ নিহিতার্থো দধাতি'। কবি প্রশ্ন রাখলেন, কোনটা সমাধান?"প্রলয়শরীর" নাকি "বিক্ষোভ,ভাসান"! কিংবা সেই তরু--"ঊর্ধ্বমূল অবাকশাখঃ এষোহশ্বথ্থঃ সনাতনঃ"---এর প্রতিধ্বনি।

কবিতার চেয়ে বিস্ময়কর পৃথিবীতে আর কিছুই নেই,থাকতে পারেনা।আর এই কবিতা বিচ্ছিন্ন কোন প্রতীতী নয়,সে সর্বোতোভাবে সমাজ ও সময় সম্পৃক্ত। তাই কবি রাহুল পুরকায়স্থ প্রণীত কাব‍্যলিপি "অন্ধের বর্ণনামতো" বইটির অনুভবী ক্রোম‍্যাটিসিটি ভাবনার আন্তরিক নৈকট্যবশত পাঠককে বলে দিতে পারে "আরও দূরে দূরাগত একা হেঁটে যায়"।

Tuesday, June 17, 2025

ষাটের যুবক | অনুরূপা পালচৌধুরী

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || ষাটের যুবক || পর্ব: ৪ ||



ষাটের যুবককে ৩য় চিঠিবাষ্পের সিন্দুক___

কল্যাণী থেকে 

         ৩য় চিঠির আস্তানায় আপাদমস্তক দুপুরটার রিংটোনে এখন আপনি অবসাদের কালবৈশাখী। অপেক্ষার ইমারতে এক একটা নূপুরের ফণায় গুনে ফেলছি নীলকণ্ঠ প্রজাপতির লোপাট বুকের শীতঝালর। 
ষাটের যুবক___ আপনাআপনি চোখ কেনো ভিজে ওঠে? জানি সে সুরম্য নদীতে আপনার দায়ভার নেই। দায় নেই মধ্যবিত্ত আমিটার অদ্ভুত আবদারচিহ্ন বাঁচাবার। না হয় একটু অন্ধকারের আরো ঘনিষ্ঠ জন্ম হোক। এ অন্ধকার আমার চিরকালীন অভ্যাসের দ্বার। দ্যাখো আঠাশের শিমূলতরবারি প্রসবহীনতায় সাতমহলা জিভের শিলমোহরে ডুবছে। প্রতিদিন নিজেকে ১বার করে পুড়িয়ে নেই আপনার রোমশ বুকের কাঁচাপাকা নিঃশ্বাসের প্রহরে। 

কথা ছিলো আসাযাওয়ার অমীমাংসিত রোদ্দুরের ছায়ায় আমার ঘরের অসুখে লেগে থাকা মাটির শীততাপে তোমার নিয়ন্ত্রিত সুখের পারদ। জানেনতো, এ শহরের অচেনা ডানায় প্রজাপতিসন্ধ্যা একান্তে জ্বলছে মৃতদেহের আড়ালে। মোচড়ানো আকাশের লালচে চোখে আমার স্বেচ্ছাচারী জীবাশ্ম শুধু তোমারই প্রশ্রয়। কতবার ভেবেছি মুখোমুখি টেবিলের ইতিহাসে পালটে দেবে তুমি এই শহরের গল্প। আজকাল চোখের ভারের চেয়ে বুকের ভার বেশী। সে ব্যাথারা কাঁদায় না। শুধু জল হয়ে গলে পড়ে দুরূহ সাদা অরণ্যের ভাঁজে। তবু আগামী দুপুরগুলো জন্ম দিই একান্ত আমার রক্তমাখা আঁতুঘুমের শরীরে। তবু কি আসবেন না আমার ভূপৃষ্ঠস্থ সূর্যসারির সমান্তরাল কবিতার তীব্র দেশান্তরে?
 
বি.দ্র. কাল দুপুরের আপেক্ষিক দক্ষিণা বাতাসের গভীরে আজকের সকাল পেড়িয়ে দুপুর। দুপুর প্রসূত সন্ধ্যা এখন রাতের অনুচর আর কাতারে কাতারে আমিটা সত্যি ভীষণরকম ভালো আছি। 
 

                      ইতি
       জন্মান্ধ কুয়াশার পুনর্জন্ম

Friday, June 13, 2025

পুরাণ থেকে প্রমাণের পথে : সরস্বতী নদী | সঞ্চারী ভট্টাচার্য

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||  সঞ্চারী ভট্টাচার্য  || পর্ব: ৩
পুরাণ থেকে প্রমাণের পথে : সরস্বতী নদী 



নদী ও বাকের মধ্যে সরস্বতীর সংযোগ কোথা থেকে উদ্ভূত? 

ভারতীয় ধর্মতত্ত্বে দেবী সরস্বতী এক বহুমাত্রিক সত্তা, যার মধ্যে একত্রিত হয়েছে জলপ্রবাহ ও বাকপ্রবাহের দুই গূঢ় ধারা। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে তিনি যেমন এক জীবন্ত নদীসরূপা দেবী, তেমনি বাণী ও জ্ঞানের আধিষ্ঠাত্রীশক্তি। এই দ্বৈত রূপ—নদী এবং বাক—সরস্বতীর মধ্যে কিভাবে মিলিত হয়েছে, তার ইতিহাস পুরাতন, গভীর এবং বহুস্তরীয়। এই সংযুক্তি কেবল একটি পৌরাণিক বিশ্বাস নয়, বরং ভারতীয় দর্শনের মধ্যে এক বিস্ময়কর প্রতীকি সূত্র। 

ঋগ্বেদের বহু মন্ত্রে সরস্বতীকে একাধারে দেবী, নদী ও মাতৃরূপে বন্দনা করা হয়েছে। “অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী”—এই মন্ত্রে তাঁর পরিচয় একত্র তিনটি রূপে। তিনি মা, তিনি নদী, তিনি দেবী। এখানেই ধরা পড়ে সেই সংযোগের সূচনা যেখানে প্রকৃতির জলরাশি হয়ে ওঠে উচ্চারণের অনুপ্রেরণা। সরস্বতীর জলপ্রবাহ শুধু ভূগোলের স্রোত নয়, তা মনের মধ্যেও বয়ে চলে ধ্বনিরূপে, বাকরূপে।

ঋগ্বেদে সরস্বতী নদীর সঙ্গে সঙ্গে 'প্রব্রাহ্মণী', 'চেতয়ন্তী সূনৃতানাং' ও ‘বোধয়ন্তী’ হিসেবে বর্ণিত। অর্থাৎ, তিনি যিনি চেতনার উদ্রেক করেন, বাকের প্রবাহ জাগিয়ে তোলেন। এইভাবে নদীর জলরাশি এক রূপক হয়ে ওঠে বাকপ্রবাহের—যেমন নদী প্রবাহিত হয় ভূমিতে, বাক প্রবাহিত হয় চেতনার ভূগর্ভে। তাঁর জলধারা যেমন বহন করে শস্যের উর্বরতা, তেমনি তাঁর বাকধারা বহন করে মনের উর্বরতা। 

এই ভাবনাটি আরও স্পষ্ট হয় উপনিষদীয় ও পুরাণীয় সাহিত্যে। ব্রহ্মার মুখ থেকে উৎপন্ন বাক যখন রূপ নিতে থাকে, তখন সেই বাক প্রতিমূর্ত হয় সরস্বতী হিসেবে। নদীর মতো যে বাক প্রবাহিত হয়, তা স্থবির নয়—চিরচঞ্চল, চিরজাগরুক। জল যেমন মৃত বস্তু নয়, তেমনি বাকও শুধুমাত্র ধ্বনি নয়; দুটোই প্রাণসম্পন্ন, প্রভাববিস্তারকারী ও রূপান্তরশীল। এই কারণে সরস্বতী কখনও কেবল নদী নন, আবার কেবল বাকও নন—তিনি এই দুইয়ের এক প্রাণময় যোগসূত্র। 

আরও গভীরভাবে দেখতে গেলে দেখা যায়, ঋষিরা যেভাবে নদীর ধারে বসে ধ্যান করতেন, সেই ধ্যানেই উঠে আসত ভেতরের বাক, অনুভব, শব্দ এবং পরিশেষে মন্ত্র। প্রকৃতির জলধারার মতো সেই ধ্বনিও ছিল শুদ্ধ, নিরবচ্ছিন্ন, অলৌকিক। এইভাবে সরস্বতী নদী থেকে দেবীতে রূপান্তরিত হন এবং বাকদেবী হিসেবে প্রতিষ্টা পান।

পৌরাণিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, প্রজাপতি ব্রহ্মা যখন সৃষ্টির প্রথম ধ্বনি উচ্চারণ করতে চাইলেন, তখন সেই ধ্বনির আকৃতি রূপ নেয় সরস্বতী হিসেবে। তিনি নিজেই ব্রহ্মার বাক, সৃষ্টির মূল শব্দ। এই বাক নদীর মতো প্রবাহিত হয়ে জগতে প্রাণ সঞ্চার করে। জ্ঞানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যেমন জল ছাড়া শস্য জন্মায় না, তেমনি বাক ছাড়া চিন্তার জন্ম হয় না। এইভাবে সরস্বতী শুধু বহমান নদী নন, তিনি ভাবনারও নদী। 

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সরস্বতী শব্দের মূল অর্থই ‘স্রোতের অধিষ্ঠাত্রী’। ‘সারস’ ধাতু থেকে এসেছে ‘সরস্বতী’, যার অর্থ প্রবাহ, ছড়িয়ে পড়া, সঞ্চালন। এখানেই নদী ও বাকের মধ্যে প্রাকৃতিক মিল—দু'টিই প্রবাহমান, জাগ্রত এবং সৃষ্টিশীল। এই কারণে সরস্বতীর চিহ্ন নদী ও বাণী—দু'টিতেই একসঙ্গে ধরা পড়ে। তাঁর জল হল ভাবের জোয়ার, তাঁর বাক হল চেতনার স্রোত।

সময় যত এগিয়েছে, সরস্বতীর নদীসত্তা ধীরে ধীরে ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও তাঁর বাকসত্তা আরও বেশি করে স্থায়ী হয়েছে সংস্কৃতির ভিতরে। বেদের বাক হয়ে, পুরাণের দেবী হয়ে, উপনিষদের চেতনা হয়ে—তিনি রয়ে গেছেন। তাই সরস্বতী নদী ও বাক—এই দুই রূপেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, এবং এই দুইয়ের সংযোগই তাঁকে দেবী হিসেবে সর্বোচ্চ স্থানে স্থাপন করেছে। এই সংযোগ শুধু এক ঐতিহাসিক রূপান্তর নয়, বরং ভারতীয় ধর্মতত্ত্বে জ্ঞান, প্রকৃতি ও চেতনার এক পরম মিলনবিন্দু। 

নদী-সরস্বতী এবং বিদ্যা-সরস্বতীর মধ্যে মূল পার্থক্য কি ?

ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মতত্ত্বের অঙ্গনেই সরস্বতী দেবী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। সরস্বতীকে নানা রূপে উপলব্ধি করা হয়। তার মধ্যে প্রধান দুটি রূপ হলো নদী-সরস্বতী এবং বিদ্যা-সরস্বতী। এই দুই রূপের মধ্যে প্রায়শই বিভ্রান্তি ঘটে, কারণ নাম এক হলেও তাদের প্রকৃতি, প্রতীক, কাজ ও অর্থভেদ ব্যাপক। নদী-সরস্বতী যেমন ছিল এক প্রাচীন, শারীরিক নদী, তেমনি বিদ্যা-সরস্বতী হলো আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দেবী। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব নদী-সরস্বতী এবং বিদ্যা-সরস্বতীর মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি।

 প্রথমত, নদী-সরস্বতী প্রকৃতপক্ষে এক ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা। প্রাচীনকাল থেকে ঋগ্বেদে সরস্বতী নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে তাকে বিশাল জলধারা, জীবনের উৎস ও পবিত্র নদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই নদী হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতীয় সমভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক মহৎ নদী ছিল, যা বৈদিক জনসমাজের জন্য একটি অমূল্য জলাধার। নদী-সরস্বতী প্রকৃতির এক অংশ, যা মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই নদীর পানি ছিল উর্বর জমির জীবনদায়ক, যা কৃষি, পরিবহণ, তীর্থ ও জীবনযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করত। পুরাণ ও ইতিহাসে সরস্বতী নদীকে মায়াময়, নির্মল ও পবিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

 অন্যদিকে, বিদ্যা-সরস্বতী হলো একটি বিমূর্ত ও আধ্যাত্মিক রূপ। তিনি জ্ঞানের দেবী, ভাষার অধিষ্ঠাত্রী এবং সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রেরণা। বিদ্যা-সরস্বতী মানুষকে চিন্তার আলো দেয়, তার বুদ্ধি ও মেধার বিকাশ ঘটায়। তাঁর আরাধনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়, কারণ তিনি বিদ্যা অর্জনে সহায়ক। বিদ্যা-সরস্বতীর রূপ কালো, সাদা বা হলুদ পোশাকধারিণী হিসেবে চিত্রিত হয়; হাতে থাকে বীণা, গ্রন্থ ও মুদ্রা। এই রূপে তিনি অশরীরী, মানবচেতনার অংশ, যার অস্তিত্ব মনের গভীরে এবং আধ্যাত্মিক জগতে নিহিত।

 দ্বিতীয়ত, নদী-সরস্বতীর ভূমিকা ছিল শারীরিক ও প্রাকৃতিক। তিনি পানির প্রবাহ, জীবনদানে সক্ষম এক প্রকৃতির উপহার। তার জল প্রকৃতিতে প্রাণ ফেরায়। সরস্বতী নদীর তীর্থ স্থানগুলি প্রাচীন থেকে পবিত্র ও আধ্যাত্মিক স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। মানুষ নদী-সরস্বতীর কাছে নিজেদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে জীবনের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করত। নদী-সরস্বতীর পানির স্রোত কৃষিজীবনকে সঞ্চালিত করে, জনজীবনে শীতলতা আনে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। নদী-সরস্বতীর স্রোত মানুষকে জীবনের মূর্ত উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়।
 
অপরদিকে, বিদ্যা-সরস্বতীর কাজ হয় মনের গভীরে। তিনি মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীল শক্তির উৎস। বিদ্যা-সরস্বতীর আরাধনা মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও শিল্প-সৃষ্টির বিকাশ ঘটায়। তার আশীর্বাদ ছাড়া শিক্ষা অর্জন অসম্ভব। বিদ্যা-সরস্বতীকে বীণাবাজি ও সঙ্গীতের দেবী হিসেবেও গণ্য করা হয়, কারণ তিনি সৃজনশীলতা ও ভাষার শুদ্ধতার প্রতীক। তিনি মানুষকে সত্য ও জ্ঞানপথে পরিচালনা করেন, যার মাধ্যমে আত্মার মুক্তি সম্ভব।

তৃতীয়ত, নদী-সরস্বতীর অস্তিত্ব ছিল দৃশ্যমান ও দৈহিক। তিনি প্রকৃতিপ্রসূত জলপ্রবাহ, যা স্পর্শ ও দর্শনীয়। ঋগ্বেদের একাধিক স্তোত্রে সরস্বতী নদীকে প্রশংসা করা হয়েছে, তার বিস্তৃত জলধারা ও শক্তির কথা বলা হয়েছে। ইতিহাস ও পুরাণ অনুসারে, এই নদী উত্তর ভারতের প্রাচীন ভূখণ্ডে প্রবাহিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে তার প্রকৃত রূপ বা স্রোত অনেকাংশে অদৃশ্য হয়ে গেছে। নদী-সরস্বতীর অস্তিত্ব লোকজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত হয়েছে। নদীর শারীরিক উপস্থিতি মানুষের জন্য শান্তি, পবিত্রতা ও জীবনের ধারক।

বিদ্যা-সরস্বতী অদৃশ্য, আধ্যাত্মিক ও বিমূর্ত। তিনি মনের গভীরে বাস করেন। বিদ্যার জ্যোতি তারই প্রকাশ। তিনি ব্যক্তির অন্তর্যামী, যার অস্তিত্ব শারীরিক নয়, বরং বুদ্ধি ও চেতনার আকাশে বিরাজমান। বিদ্যা-সরস্বতীর মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান আহরণ করে, কলা-কৌশলে পারদর্শী হয়। তাঁর অস্তিত্ব মনের আভা ও চিন্তার প্রবাহের মধ্যে নিহিত।

চতুর্থত, প্রতীক ও চিহ্নের দিক থেকে নদী-সরস্বতীকে জল, প্রবাহ, নদী ও নদীতীর দিয়ে বোঝানো হয়। তিনি প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক নদীর মতো এক বিস্তৃত স্রোত, যা জীবনধারা বহন করে। নদী-সরস্বতীকে অনেক সময় সাদা রঙের প্রবাহময় জলধারা হিসেবেও চিত্রিত করা হয়। এদিকে, বিদ্যা-সরস্বতীকে বীণা, গ্রন্থ ও সাদা পোশাক পরিহিত দেবী হিসেবে দেখা হয়। তিনি বুদ্ধি, ভাষা ও শিল্পের দেবী, যিনি মানুষের জ্ঞানচেতনার আলো জ্বালান।

পঞ্চমত, ধর্মগ্রন্থে নদী-সরস্বতীর উল্লেখ ঋগ্বেদ ও পুরাণে পাওয়া যায়। ঋগ্বেদের অনেক মন্ত্রে সরস্বতী নদীর গৌরব ও শক্তি বর্ণিত হয়েছে। পুরাণেও নদী-সরস্বতীকে ভূমির পবিত্র স্রোত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যা-সরস্বতী সম্পর্কে বেশি তথ্য পাওয়া যায় উপনিষদ ও বেদান্তে, যেখানে তিনি বিশ্ববাকেরূপে পরিচিত। এই সমস্ত শাস্ত্র সরস্বতী দেবীর ভিন্ন দিক তুলে ধরে, যা দর্শনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

সারসংক্ষেপে, নদী-সরস্বতী হলো প্রকৃতির এক প্রাণবন্ত নদী, যিনি জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আমাদের দৈহিক ও প্রাকৃতিক পৃথিবীর অংশ। আর বিদ্যা-সরস্বতী হলো মানব মনের আভ্যন্তরীণ দেবী, যিনি বিদ্যা, বাণী ও সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা। নদী-সরস্বতী যেমন জীবনের উৎস, তেমনি বিদ্যা-সরস্বতী জ্ঞানের আলো। দু’টি রূপ আলাদা হলেও তারা একে অপরের পরিপূরক। একত্রে তারা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রাণশক্তি।

 এইভাবে আমরা দেখতে পাই, সরস্বতী দেবীর নদী ও বিদ্যার রূপের মধ্যে পার্থক্য মূলত তাদের প্রকৃতি, কাজ ও অস্তিত্বের ক্ষেত্রের ভিত্তিতে। নদী-সরস্বতী আমাদের জীবনের দৈহিক দিককে উর্বর করে, আর বিদ্যা-সরস্বতী মন ও বুদ্ধির দিককে আলোকিত করে। দুই রূপ একসাথে ভারতীয় চেতনার গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করে।

 
তথ্যসূত্র –

১. ভারতের হারিয়ে যাওয়া নদী ও সভ্যতা – সুধাংশু সরকার, ২০১০
২. সরস্বতী নদীর অজানা কাহিনি – প্রবীর ঘোষ, ২০১২
৩. ভারতের প্রাচীন জলপথ: সরস্বতী – হিরণ্ময় বসু, ২০১১
৪. সরস্বতী নদীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি – রাকেশ শর্মা, ২০১৩
৫. ভারতীয় সংস্কৃতিতে নদীর ভূমিকা – অঞ্জনা মিত্র, ২০১৪

Tuesday, June 10, 2025

ষাটের যুবক | অনুরূপা পালচৌধুরী

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||  ষাটের যুবক || পর্ব: ৩ ||



রাণাঘাট থেকে 

গভীর দুপুরে আমার ষাটের যুবককে লেখা ২য় চিঠিবাসর।

ষাটের যুবক___

                     ১ম বাসর খামবন্দী রেখেই ২য় বাসরের অপেক্ষা না করে যুবকজ্বরের অন্তিমশয্যায় ১খানা খানাখন্দের ঘর জমা রাখলাম। অজুহাতের শরীর ছিন্ন করে হাজার ভীরে আমার চোখের দালান অস্পষ্ট হয় নীলকণ্ঠ প্রজাপতির হাড়গোড়ের  উপত্যকায়। তুমি কি বুঝেছিলে অবসাদহীন মেঝের ফাপা শূন্যতাবোধে নিষিদ্ধ মোমজামার বরাদ্দ আগুনের সলতেটাকে? এ যাবৎকাল দেখা হবে কিনা জানি না। যদি দেখা হয় শুধু হাতের কেলভিনে জমানো কিছু উষ্ণ পালকের গঙ্গা বইয়ে দিতে চাই।

আমার ষাটের যুবক! আপনাকে লুকিয়ে লুকিয়ে বহু দেখেছি আর ভেবেছি এ আমার সর্ব কালের যুবাপুরুষ।আমার ঘরভরা বসন্তের সংসার। হাতাখুন্তির টুংটাঙে আমার ছন্দহীন অক্ষরের অন্তর্বাসে আপনিটা বড্ড তুমি পাগল হয়ে ওঠে যখনতখন। আপনার ১টা পোস্টে দোকানঘরের শেয়ার মার্কেট,দালাল,ধোঁয়া ওঠা ভাঁড়ের স্টেশন চত্বর, গুঁড়ো বিস্কুটের সোদা প্রসূতি হাসপাতাল থেকে শুরু করে কুমারী মায়ের নষ্ট ভ্রূণ,বেশ্যার রোমাঞ্চিত প্রিপেইড ঘন লাশ আর অন্ধকার গলির আমিতে বড্ড লড়াই চলে।হাজার লাইক, শেয়ারের স্রোতে ভাসতে ভাসতে শীতবস্ত্রের সশস্ত্র পাহাড়ায় আপনার সাদা পাজামার সখে ঘুরপাক খায় আমার আঠাশ বসন্তের মাছভাত।

ষাটের যুবক....দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? সৌভাগ্যের দরজায় এখন আর লেবুলঙ্কার আচার শুকাই না। আগামীর দুপুরঘন ছাদটা বন্দক দিলাম। বিনিময়ে সাথে থাকার লোভে হাইতোলা আঁচলের প্রতিশ্রুত উদ্বেগের মজ্জাঘড়ির দূরস্থ সময়। ষাট বাষ্পের বাষ্পীয়রথের শুকনো গোলাপ এখনো জমা পড়ে আছে কোন ১ অংক খাতার শেষ পাতায়। আগামী ৩০ বসন্তের গচ্ছিত গোলাপি শহরে আমাদের বেপরোয়া পতাকাপথ হেঁটে যাবে বিজয় উল্লাসে।মনে পড়ে, বাবা কেজিদরে পুরনো খাতা বিক্রি করলে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। কিন্তু নতুন কাগজের গন্ধ অভিলাষী অভুক্ত সুখে সে দুঃখ ভুলে যেতাম। সে গন্ধধ্বনি বরাবরই আমার বড় প্রিয়। সে প্রিয়তার প্রথম কবিতা মানসী হোচট খেতে খেতে এখন ঘন ভাতের দাবী অবশ্য করে না।তবে আপনার আসার অপেক্ষায় প্রতিদিন একটু একটু করে রোদআলতায় পা বুলায়।

অবশেষে বলি, অগোছালো আয়নার আয়ুঘরে ধারাবাহিক চুমু খেলেও এ শহরের নির্ঘুম বেহালা শিহরিত হয় না।    

                               ইতি

                 জন্মান্ধ কুয়াশার পুনর্জন্ম।


Thursday, June 5, 2025

পুরাণ থেকে প্রমাণের পথে : সরস্বতী নদী | সঞ্চারী ভট্টাচার্য

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || সঞ্চারী ভট্টাচার্য 
পুরাণ থেকে প্রমাণের পথে : সরস্বতী নদী
পর্ব:২


দেবী সরস্বতী নদীরূপে প্রথম কোথায় আবির্ভূত হন?

ভারতীয় আধ্যাত্মিক, পৌরাণিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের ধারায় দেবী সরস্বতী এক বহুমাত্রিক সত্তা। আজ যাঁকে আমরা জ্ঞান, সঙ্গীত ও বাণীর দেবী রূপে জানি, তিনি আসলে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হন একটি নদী রূপে। এই নদীরূপই তাঁর প্রাচীনতম এবং মূল রূপ। এই নদীরূপে সরস্বতীর প্রথম ও সুস্পষ্ট আবির্ভাব দেখা যায় ঋগ্বেদে। প্রশ্ন হল, এই নদী প্রথম কোথায় আবির্ভূত হয়? কেবল আধ্যাত্মিক বা সাংস্কৃতিক দিক থেকে নয়, ভৌগোলিক ও পুরাণগত দিক থেকেও এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ।

ঋগ্বেদে সরস্বতীকে বলা হয়েছে “নদীতমা”, অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ নদী। ঋগ্বেদ ৬.৬১.১–১৩ সূক্তে সরস্বতীকে একটি প্রমত্ত, সজীব, প্রসারিত নদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে তাঁর প্রবাহের উৎসস্থানের বর্ণনায় বলা হয়েছে—তিনি পর্বত থেকে গড়িয়ে পড়েন এবং সমতলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হন। “সপ্তসিন্ধবঃ” অঞ্চলের মধ্যে সরস্বতীর অবস্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই সপ্তসিন্ধব অঞ্চলটি বর্তমানের উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিস্তৃত ছিল—বিশেষত পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের একাংশ। এই অঞ্চলেই দেবী সরস্বতী নদীরূপে প্রথম আবির্ভূত হন বলে প্রাচীন বেদীয় সাক্ষ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ঋগ্বেদে বারবার “সরস্বতী” নামের সঙ্গে এক প্রবাহমান, ধ্বনিপূর্ণ, প্রমত্ত নদীর প্রতিচিত্র ফুটে ওঠে। এই নদী ‘বৃহৎ ধারা বিশিষ্ট’, ‘সাতটি শাখা যুক্ত’, এবং যার প্রবাহ পৃথিবীর বুক জুড়ে বিস্তৃত। সরস্বতীকে বলা হয়েছে—“ইয়ান্নি গ্রামাণি চ চর্ষণীনাম্‌ ধেনুর্ন শিশে আসমতী ইব” (ঋগ্বেদ ৬.৬১.৯), অর্থাৎ তিনি যেমন জনপদ ও গ্রামপল্লীকে জীবনদায়িনী রূপে প্রবাহিত করেন, তেমনই তিনি দুধেভরা গাভীর মতো স্নেহময়ী। এই বর্ণনায় একটি নদীর প্রতি আরাধনার মধ্যে দিয়ে এক মাতৃরূপ উদ্ভাসিত হয়।

বহু গবেষণায় এই নদীর অবস্থানকে বর্তমান ভারতের ঘঘর নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ঘঘর নদী হিমালয়ের শিওয়ালিক পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে হরিয়ানা ও রাজস্থানের মরু অঞ্চল অতিক্রম করে পাকিস্তানের হাকড়া নদীপ্রবাহে মিশে যায়। আধুনিক ভূগোলবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, সরস্বতী নদী আদিতে ঘঘর-হাকড়া নদী ছিল, যেটি ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়, কিন্তু তার বালির নীচে প্রাচীন নদীখাতের চিহ্ন এখনও বিদ্যমান।

উপগ্রহচিত্র ও ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এই ঘঘর-হাকড়া নদীর উত্স ছিল হিমালয়ের শাখা নদী সরযূ, সুতলজ ও দৃষ্টি নদী থেকে, যেগুলি একত্রিত হয়ে সরস্বতী রূপে প্রবাহিত হতো। এই নদীর উৎপত্তিস্থান হিমালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে যমুনা ও সুতলজের মধ্যবর্তী উচ্চভূমি অঞ্চল। এখানে আজকের আম্বালা, কুরুক্ষেত্র, ক্যাথল, হিষার, স্যারসা অঞ্চলে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলই সরস্বতী নদীর শৈশবভূমি ছিল। অর্থাৎ, দেবী সরস্বতী নদীরূপে প্রথম আবির্ভূত হন হিমালয়ের কোলঘেঁষা এই অঞ্চলেই।

পুরাণে সরস্বতীর আবির্ভাবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ভিন্ন আখ্যান পাওয়া যায়। স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে, সরস্বতী হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ত্রিলোক প্রবাহিনী রূপে প্রবাহিত হন। আবার, ব্রহ্মান্ড পুরাণে উল্লেখ আছে যে ব্রহ্মার কপাল থেকে সরস্বতী নির্গত হন এবং জলরূপে প্রবাহিত হয়ে ‘ব্রহ্মাবর্ত’ নামে একটি অঞ্চল সৃষ্টির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই ব্রহ্মাবর্ত অঞ্চলটিকেই আধুনিক গবেষকরা উত্তর ভারতের কুরুক্ষেত্র-হরিদ্বার অঞ্চলের সঙ্গে মিলিয়ে থাকেন। এই ভূখণ্ডই আর্য সংস্কৃতির প্রথম কেন্দ্র এবং সরস্বতীর নদীস্বরূপ প্রথম প্রতিষ্ঠার স্থান।

মহাভারতে এই নদীর একাধিক অবস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে সরস্বতী কখনও ধৃতরাষ্ট্রের সভায় আলোচনার বিষয়, কখনও বনবাসী পাণ্ডবদের তীর্থস্থান। বিশেষত “সরস্বতী প্রবা”, “ব্রাহ্মণীর ধারা” প্রভৃতি নামধারণ করে তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের বহু অঞ্চলে প্রবাহিত হয়েছেন বলে উল্লেখ আছে। মহাভারতের সূত্র অনুযায়ী, সরস্বতী প্রথম আবির্ভূত হন প্লকষ নামক বটবৃক্ষের নিকটে, যা অবস্থিত ছিল হিমালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে, যেখানে আজকের পাঞ্জাব অঞ্চলের মানসা ও সাঙ্গুর শহরের সন্নিকট এলাকায় সরস্বতীর প্রবাহচিহ্ন ধরা পড়ে।

তন্ত্রশাস্ত্রেও সরস্বতী নদীর প্রথম আবির্ভাবস্থানকে এক আত্মিক উৎসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বীজমন্ত্র ‘ঈঁ’ শব্দধ্বনির আদি-উচ্চারণস্থল যেখানে, সেখানেই সরস্বতী নদীর উৎস। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবমস্তিষ্কে যেখানে চিন্তা ও বাকের উদ্ভব, সেই অঞ্চলই একপ্রকার সরস্বতীর অন্তর্জল উৎস। যদিও এটি আধ্যাত্মিক রূপক, তবে তা ঐতিহ্যের উৎস অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে সরস্বতীর প্রথম আবির্ভাবস্থান সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হল—কালিবঙ্গা। এটি রাজস্থানের উত্তরাংশে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, যেখানে ঘঘর নদীর অববাহিকায় এক বিস্তৃত নগর সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। এখানে সেচ ব্যবস্থার নিখুঁত প্রমাণ ও নদীঘেঁষা গৃহনির্মাণের চিহ্নে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই নদী (সরস্বতী) সেখানে মূল জীবনরেখা হিসেবে কাজ করত। এর আগে হরিয়ানার বানওয়ালি, রকিগড়ি, কুরুক্ষেত্র অঞ্চলেও প্রাচীন সরস্বতী সভ্যতার চিহ্ন দেখা গিয়েছে। এসব অঞ্চল থেকেই সরস্বতীর প্রবাহ শুরু হয়েছিল।

ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ স্যার রিচার্ড টেম্পল এবং পরবর্তীকালে রোমিলা থাপার, মাইকেল ড্যানিনো প্রমুখ ঐতিহাসিক গবেষকরা সরস্বতী নদীর আবির্ভাবের স্থান নির্ধারণে বহু প্রাচীন এবং আধুনিক মানচিত্র, জলপথ ও ভূপ্রকৃতির উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন—এই নদীর উৎপত্তিস্থান হিমালয়ের শাখানদীসমূহ দ্বারা সৃষ্ট, এবং তা হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রাজস্থান পেরিয়ে সিন্ধুপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হতো। অনেক গবেষণায় তো বলা হয়েছে, এক কালে সরস্বতীর প্রবাহ গঙ্গা-যমুনার থেকেও প্রমত্ত ছিল।

এই নদীর হারিয়ে যাওয়া বা গর্ভগামী হয়ে যাওয়া এক চরম সাংস্কৃতিক প্রতীক। পুরাণে বলা হয়েছে, পাপপ্রভাবে ও যুগের পরিবর্তনে সরস্বতী এক সময় ভূমিগত হয়ে যান। তিনি স্থূল জলধারারূপে আর দৃশ্যমান থাকেন না, বরং অন্তর্জলে, আধ্যাত্মিক বোধে, শব্দের অন্তর্জগতে রূপান্তরিত হন। সেই অর্থে তাঁর আবির্ভাবের স্থান আজও জীবন্ত, তবে তা জলের মধ্য দিয়ে নয়, বরং মানুষের বুদ্ধির, ভাষার ও চিন্তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

সারাংশে বলা যায়, দেবী সরস্বতী নদীরূপে সর্বপ্রথম আবির্ভূত হন হিমালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ থেকে প্রবাহিত হয়ে হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত অঞ্চলে। এখানেই তিনি ভৌগোলিক বাস্তবতায় জলধারারূপে উদ্ভাসিত, এবং এখান থেকেই পরবর্তীকালে তিনি সংস্কৃতি, ভাষা ও আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত হন এক দেবীরূপে।

নদীরূপে সরস্বতীকে কোন দেবী তত্ত্বের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়?

 ভারতীয় ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় দেবী সরস্বতী কেবলমাত্র জ্ঞান, সঙ্গীত ও ভাষার দেবী নন; তিনি আদিতে নদী, এবং সেই নদী-রূপেই তিনি বহু তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও উপনিষদীয় ব্যাখ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। নদী যখন প্রবাহমান, প্রাণবন্ত, জীবনদাত্রী ও ধ্বনিপূর্ণ, তখন তার মধ্যে এক দেবীস্বরূপ মহাশক্তির অনুভব অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষিতেই প্রশ্ন ওঠে—এই নদীরূপী সরস্বতী আসলে কোন দেবী তত্ত্বের প্রতীক? কেবল প্রকৃতির এক জলধারা, না কি বেদান্ত, তন্ত্র ও শক্তিবাদের গূঢ়তর উপাদানের রূপ?
 
দেবী সরস্বতীর নদী-রূপটি সবচেয়ে পুরনো ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে উদ্ভাসিত হয়। সেখানে তিনি “নদীতমা”, “অম্বিতমা”, “বেষ্টতমা”—অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ নদী, সর্বশ্রেষ্ঠ মাতা, সর্বোৎকৃষ্ট শক্তি। এই বর্ণনাগুলোর মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাঁর বহুমাত্রিক তত্ত্বগত পরিচয়। সরস্বতী সেখানে শুধু ভূগোল নয়, সৃষ্টির এক গতিশীল চেতনা। এই প্রবাহরূপী চেতনা, যা শব্দ, চিন্তা, বুদ্ধি ও আলো জাগায়, তা দেবী তত্ত্বে এক বিশেষ অবস্থান বহন করে। এবং এই অবস্থানকে বোঝার জন্য আমাদের দেখতে হবে তিনটি প্রধান তত্ত্বধারা—বেদান্ত, তন্ত্র, ও শাক্ত দর্শন—যাঁরা সরস্বতীর নদীরূপকে এক বিশেষ প্রতীকী পরিধিতে ব্যাখ্যা করেছেন।

১. আদিশক্তির ‘জ্ঞানের স্রোত’ রূপে সরস্বতী

শাক্ত দর্শনে, বিশেষত ‘শ্রীবিদ্যা’ এবং কুলাচার তন্ত্রে, সরস্বতী নদীরূপে ধরা হন আদ্যাশক্তির এক বিশেষ প্রকাশ হিসেবে। শক্তির তিন প্রধান রূপ—সরস্বতী, লক্ষ্মী ও কালী। এই তিন রূপই প্রাকৃতিক ও মনঃপ্রকৃতিগত গুণের সঙ্গে যুক্ত—সরস্বতী যুক্ত তমোগুণ শুদ্ধিকারী ‘সত্ত্বগুণ’-এর সঙ্গে। নদী সরস্বতী প্রবাহমান জ্ঞান, শব্দ এবং ধ্যানের প্রতীক। নদী যেমন মৃত জমিকে সজীব করে, তেমনি সরস্বতীর নদীরূপ জড়চিত্ত মানবতাকে সজীব, মননশীল ও জাগ্রত করে তোলে। এই প্রবাহ একরকম জ্ঞানশক্তির মহাশক্তি—একেবারে তত্ত্বগত স্তরে।

তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত ‘নদী’ বা ‘সরঃ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থই হল যা প্রবাহিত হয়। সরস্বতী শব্দের মূল 'স্রু' ধাতু, যার অর্থ প্রবাহ। এই প্রবাহ কেবল জল নয়—এ এক জ্ঞানের ধারা, শব্দের ধারা, চেতনার ধারা। অতএব নদীরূপী সরস্বতী আসলে আদ্যাশক্তির বাকশক্তি রূপ। বেদে বলা হয়েছে, বাক অর্থাৎ বাক্যরূপী শক্তি জগত সৃষ্টি করে। সেই বাক শক্তির স্বরূপই নদী সরস্বতী।

 ২. শব্দব্রহ্ম ও সরস্বতী

উপনিষদীয় দর্শনে শব্দকে ‘ব্রহ্ম’ বলা হয়েছে—‘শব্দ ব্রহ্মণি নিস্রুতম্‌’। নদীরূপে সরস্বতী এই শব্দব্রহ্মের বহমানতা। ব্রহ্মের সৃষ্টি ক্রিয়া শব্দের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। সেই শব্দধারার প্রতীক সরস্বতী। এবং এই শব্দ একদিকে ধ্বনি, অন্যদিকে চিন্তা ও বুদ্ধি। এইভাবে নদীসরস্বতী হয়ে ওঠেন জ্ঞানের আদি-মাধ্যম। তিনি একাধারে ধ্বনি, প্রতিধ্বনি, ধ্যান, মনন—যা গড়ে তোলে মনের নদী।

এই তত্ত্বে নদীসরস্বতী হচ্ছেন মৌলিক শব্দতত্ত্বের জীবন্ত প্রতীক। শব্দ, বাক ও অর্থ—এই ত্রয়ী শক্তির সম্মিলনই নদীসরস্বতীর বর্ণনা। এই তিন শক্তির মিলনে জ্ঞান জন্মায়, সংস্কৃতি গঠিত হয়। তাই উপনিষদ বলেছে—যেখানে বাক ও চিন্তার নদী মিলে যায়, সেখানেই ব্রহ্ম উপলব্ধি সম্ভব।

 ৩. সৃষ্টির সূচনায় জলতত্ত্ব এবং সরস্বতী

ঋগ্বেদ, শিবসংহিতা, এবং অনেক তান্ত্রিক সূত্র অনুযায়ী, জগতে প্রথমত সৃষ্টি হয়েছিল আপঃ—জল। সমস্ত সৃষ্টি সেই জলে ভাসমান ছিল। এই আদিজলরূপেই সরস্বতী প্রতীক হয়ে ওঠেন সৃষ্টির প্রথম পরিবেশ। তাই নদীসরস্বতী কেবল মর্ত্য জগতের বহমান নদী নন, তিনি সৃষ্টির প্রথম স্তরের তত্ত্বরূপী জলরাশিরও প্রতীক।

এই নদী একাধারে আধিভৌতিক জলের প্রতীক, আবার আধ্যাত্মিক চেতনারও ধারক। এই কারণে শাক্ত তন্ত্রে সরস্বতী নদীকে “চিন্ময়ী গঙ্গা” বলা হয়েছে। চিন্ময়ী অর্থাৎ চেতনার নদী—যা দেহ ও মন দুইকেই শুদ্ধ করে।

৪. যোগতত্ত্বে সরস্বতী নদী ও 'সুষুম্না নাড়ী'

যোগশাস্ত্রে মানুষের শরীরের ভিতরে তিনটি প্রধান 'নাড়ী' বা প্রণাশক্তির পথ বর্ণনা করা হয়েছে—ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। সরস্বতী কখনও কখনও ‘সুষুম্না নাড়ী’র প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হন। যেমন হঠযোগ প্রদীপিকা-তে বলা হয়েছে—‘সরস্বতী নদী’ শরীরের ভিতরে একটি গোপন প্রণাচ্যানেল, যেখান দিয়ে কুণ্ডলিনী শক্তি প্রবাহিত হয়ে মাথার চূড়ায় পৌঁছয়। এই নদী, যা বাইরের জগতের নয়, বরং আমাদের অন্তর্চেতনায় গোপনে প্রবাহিত, সেই নদীই হল একেবারে অভ্যন্তরীণ সরস্বতী।

এইভাবে, নদীসরস্বতী একটি যোগতাত্ত্বিক পথ, যা শরীর থেকে মনের, মন থেকে আত্মার জগতে প্রবাহিত হয়।

৫. পুরাণতত্ত্বে সরস্বতী—স্থূল থেকে সূক্ষ্মের যাত্রা

পুরাণে সরস্বতী নদী প্রথমে স্থূলজলে প্রবাহিত হন। পরবর্তীতে তিনি অন্তর্হিত হন মাটির নীচে। এই গর্ভগমন একেবারে দার্শনিক স্তরে এক বিশেষ অর্থ বহন করে—জ্ঞানচেতনা বা বাকশক্তি যখন বাইরের জগতে ধরা দেয় না, তখন তা ভিতরে ডুবে যায়, অন্তর্মুখী হয়। অর্থাৎ, নদীরূপ সরস্বতী হলেন স্থূল থেকে সূক্ষ্মের যাত্রার প্রতীক।

এই দৃষ্টিতে সরস্বতী হলেন 'অলিখিত উচ্চারণ' বা পরাবাক। শব্দের চারটি স্তর বলা হয়—পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা, বৈখরী। বৈখরী মানে উচ্চারিত শব্দ, মধ্যমা মানে ভাবনা, পশ্যন্তী মানে ইচ্ছা, আর পরা মানে নির্জন, নিরাকার শব্দতত্ত্ব। নদীসরস্বতী এই পরা শব্দের রূপ, যা আমাদের চিন্তা ও প্রাণশক্তিকে বহন করে নিয়ে যায় উচ্চতর উপলব্ধির দিকে।

৬. নদীসরস্বতী ও 'স্মৃতি-সংস্কৃতি'র ধারা

নদীসরস্বতী কেবল এক প্রকৃতির স্রোত নয়, তিনি এক সাংস্কৃতিক ধারার প্রতীক। ভারতীয় সংস্কৃতির বহু আদি সভ্যতা, যেমন হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, কালীবঙ্গা, বানওয়ালি—এসবই সরস্বতী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। সেই অর্থে এই নদী হলো সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সভ্যতার ধারক। দেবী সরস্বতী তাই ইতিহাসের গভীরতম স্তরে জ্ঞান, শিল্প, কৃষি, সভ্যতা ও ধর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন।
 
এই প্রেক্ষাপটে নদীসরস্বতী হলেন ‘ধারা’র প্রতীক—যা ছিন্ন হয় না, যা বহমান।

দেবী সরস্বতী নদীরূপে প্রতীক রূপে প্রকাশ করেন জ্ঞানের প্রবাহ, বাকশক্তির গতিময়তা, শব্দতত্ত্বের গভীরতা, চেতনার উন্নয়ন, এবং স্মৃতির ধারাবাহিকতা। তিনি শুধু একটি মাটির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারা নন, তিনি সময়, সংস্কৃতি, মনন, ও মরমী জগতের প্রতিচ্ছবি। সেই জন্য নদীসরস্বতী হলেন তত্ত্বগতভাবে—


জ্ঞানের আদি উৎস
চেতনার প্রবাহ
বাক ও ধ্বনির প্রতিমা
অন্তর্জগতের আত্মা
সৃষ্টি ও স্মৃতির ধারাবাহিকতা

অতএব, নদীরূপী সরস্বতী কেবল ভূগোলের বিষয় নন; তিনি ভারতীয় মননের সবচেয়ে গভীর, সূক্ষ্ম এবং বহমান দেবী তত্ত্বের এক শ্রেষ্ঠ রূপ।

 

 

তথ্যসূত্র –

১. ভারতীয় সংস্কৃতিতে সরস্বতীর স্থান – ড. লক্ষ্মীনারায়ণ মিশ্র, ১৯৯৭

২. সরস্বতী নদী ও হরিয়ানা – প্রবীণ চৌধুরী, ২০০০

৩. ভারতের হারানো জলস্রোত – প্রণব মুখোপাধ্যায়, ২০০২

৪. সরস্বতী: নদী এবং সভ্যতা – ড. বিভাস ঘোষ, ১৯৯৬

৫. পুরাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সরস্বতী – অশোক বর্মণ, ২০০৪