নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৬]
নাগরিকের কাহিনী ও বিস্তার
.............................. ..............
ভাঙন ও অবক্ষয়ের মধ্যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার যে গতিটি 'নাগরিক'-এ বিধৃত, তা আমাদের স্পর্শ করে ঠিকই।
দীর্ঘদিন নিষ্ঠা সহকারে শিক্ষকতা করেছেন রামুর বাবা, তাঁর অবসরজীবনে গুরুতর আর্থিক সংকট। কদর্য সমাজব্যবস্থার অকৃতজ্ঞতায় ব্যথিত প্রৌঢ় মানুষটি পরিমণ্ডলের ওপর সমস্ত আস্থা হারিয়েছেন, আছে কেবল অবিমিশ্র নৈরাশ্য। চাকরী পাওয়া যে প্রায় লটারি জেতার সমান, এই কথায় জীবনযুদ্ধে অনভিজ্ঞ ছেলেকে তিনি কেবল নিরুৎসাহই করেন। অথচ যৌবনধর্মে আপ্লুত নায়ক রামু, সঙ্গী তার উদ্যম। বাবার নৈরাশ্য স্বভাবতই তার মনঃপূত নয়। নিজের খণ্ডিত উপলব্ধি আর আবেগের নিরিখে দুজনেই নিজেকে জাহির করে, ফলত উভয়ের মধ্যসৃষ্টি হয় ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।
অন্যদিকে, বিজ্ঞানের ছাত্র সাগর কাজ নিয়েছিল জাল ওষুধ তৈরির কারখানায়। নৈতিক বিচারে নিন্দনীয় এই জীবিকাই কিন্তু অর্থনৈতিক তাৎপর্যের গুরুত্বে সাগরকে দেয় বিশেষ সামাজিক মর্যাদা। পেয়িং গেষ্ট অনাত্মীয় এই যুবকটিই রামুদের সংসারে সম্মানের আসনটি দখল করে-রামু যে সম্মান থেকে বঞ্চিত, বেকারত্বের দায়ে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে তুচ্ছ রক্তের সম্পর্ক কিংবা নৈতিক বিচার।
অবক্ষয়কবলিত এই পরিবেশে নারী জীবনের দুর্দশার চার প্রতিনিধি-রামুর মা, বোন সীতা, প্রেমিকা উমা আর উমার বোন শেফালী।
অদূর-অতীতে আর্থিক স্বচ্ছলতার আস্বাদ পেয়েছিলেন রামুর মা, আজ যিনি সংসারের জোয়াল-কাঁধে ব্যতিব্যস্ত। অতীতের সুখস্মৃতি ঝাপসা হয়ে এলেও, তাকে আঁকড়ে রাখতে চান তিনি, নিষ্ঠুর বর্তমানকে সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
মধ্যবিত্ত ঘরের আরো অনেক কুমারী মেয়ের মতোই তাঁর মেয়েটিকেও মেয়ে-দেখা নামক নিষ্ঠুর এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, আর বারবারই সহ্য করতে হয় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমান। বয়স বেড়েই চলে সীতার। ঘাটতি রূপের পসরায়, অভাব কাঞ্চনমূল্যের। হতাশা-বঞ্চনা-অপমান এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় সীতাকে, যখন সে নির্লজ্জের মতো আশ্রয় ভিক্ষা করে সাগরের কাছে, বিয়ের প্রস্তাবে। প্রেমের চেয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নই তখন জরুরী।উমার অবশ্য মর্যাদাহানিকর কোনে স্পষ্টভাষণের পথ নয়। কবে রামু চাকরী পেয়ে বিয়ে করবে তাকে, প্রতীক্ষায় যৌবন পার করে দেয়। তারও সংসারে অচল অবস্থা। বোন শেফালীর প্রায়-প্রকাশ্য গণিকাবৃত্তি, বাধা দিতে পারে না উমা-অর্থনৈতিক অনিবার্যতা। নিশ্চেষ্ট সে শুধু ভোগে মানসিক টানাপোড়েনে। ভাঙন রোধ করবে সক্রিয় প্রচেষ্টায়, এ-শক্তিও তার নেই। আছে শুধু দুর্বোধ্য এক নিস্পৃহভাব।অথচ শেফালী তো তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়েছে সচেতনভাবেই। সম্মানজনক কোন পেশায় নিযুক্ত হওয়ার মতো শিক্ষা বা ক্ষমতা তার নেই। নারীদেহটি মূলধন করেই পথে নামে সে-'খেতে হলে একটা কিছু করতে হবে তো।' হঠাৎ অল্প-পরিচিত এক পুরুষের ডাকে সে ঘর ছাড়ে বরাবরের মতোই।
-চারটি নারী, বস্তুত একই খাদক সংস্কৃতির চারটি শিকার।
আর এক বিকৃতি উমাদের নীচতলার এক কোণের ভাড়াটে যতীনবাবু। বেকার প্রৌঢ়। সাধ্য নেই, তবু সাধ রয়েছে প্রচুর। নানা ছুতোয় হাত পাতেন এর-তার কাছে। অথচ মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধও তাঁর প্রখর। সব পয়সাই 'ধার' নেন তিনি, 'শোধ' দিয়ে দেবেনই পরে কোন এক সময়ে!
রাজনৈতিক চেতনাবর্জিত, কূপমণ্ডুক এই চরিত্রগুলিকে তাদের বিবিধ দুর্বলতা নিয়ে উপস্থিত করে অবক্ষয়কবলিত, পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলেন ঋত্বিক। কোথাও তাকে সহনীয় করে তোলার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টাও তাঁর নেই। তবু, বিশেষ এক অসম্পূর্ণতাবশত ঘটনাটি হয়ে থাকে নিছক এক পরিবেশন (প্রেজেনটেনশান), কোন বিশ্লেষণের (এ্যানালিসিস) স্তরে পৌঁছয় না।
প্রত্যেক সামাজিক প্রক্রিয়ার মতো অবক্ষয় নামক এই ক্রমবর্ধমানব্যাধিটির পিছনেও যে আছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির ঘাতপ্রতিঘাত, সেগুলির উল্লেখ অস্পষ্ট বড়ো, সরাসরি পাদপ্রদীপের আলোয় তাদের নিয়ে আসেন নি ঋত্বিক। রামুদের অর্থনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিক অধোগতি-ভদ্রাসন বিক্রী করে তথাকথিত ভদ্রপাড়ায় ছোট বাসা ভাড়া নেওয়া, তারপর সেখান থেকেও চলে গিয়ে বস্তীবাড়িতে ওঠা-এর মধ্য দিয়ে ক্রমব্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংকটের মোটামুটি একটি পরিপ্রেক্ষিত আসে বটে। কিন্তু এতেই কি স্পষ্ট হয় যে সামাজিক প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল?
এ ছবির শুরু বলিষ্ঠ এক পুরুষমূর্তির ঘর্মাক্ত কলেবর দেখিয়ে; অনবরত হাতুড়ি চালিয়ে চলেছে সে। ছবির শেষ হয় ওই একই প্রতীকের পুনরাবৃত্তিতে। ইতিমধ্যে ছবির নায়কের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমাদের, বোঝা গেছে পুরুষ মূর্তিটি এল রামুরই প্রতীক হয়ে, প্রতিকূল পরিবেশে অদম্য প্রত্যয়ই যার পাথেয়। মধ্যবর্তী আবর্তনের চক্রে ঘুরে ফিরেই আসে প্রত্যয়ের দীপ্ত প্রকাশ। সুরটি অবশ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই রকম চড়াপর্দায় বাঁধা। রামু বারবার চিৎকার করে জানায় 'আমি মানি না, মানব না'। বৃদ্ধ বেহালাবাদকের তোলা অচেনা অথচ উদ্দীপনাময় এক সুর তার তন্ত্রীতে জাগায় অনুরণন, জোগায় অনুপ্রেরণা। প্রত্যয়ের সুর বাজে ছবিতে 'আন্তর্জাতিক'-এর একাধিক প্রয়োগে।
লক্ষণীয় রামুর উচ্চকণ্ঠ, বেহালার তান, 'আন্তর্জাতিক'-এর ছন্দ-ঘটনাবলীর সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র খুবই অস্পষ্ট। তবু নাটকীয়ভাবে এদের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আসলে প্রত্যয়ের এহেন অভিব্যক্তি, তার প্রতীকী ও ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ-এসবের মধ্য দিয়ে ঋত্বিক উদঘাটন করেন কেবল মধ্যবিত্তসুলভ রোম্যান্টিসিজম। সম্পূর্ণ আবেগনির্ভর এই মানসিকতার উৎস সন্ধানে যাওয়া বৃথা। কোন কোন শক্তি একে পুষ্ট করে, রক্ষা করে, সদুত্তর মিলবে না ও প্রশ্নেরও অথচ একেই ঋত্বিক ব্যবহার করতে চান পার্থিব কষ্টমোচনের হাতিয়ার হিসেবে।
রামুর বন্ধু সুশান্তর চরিত্রও এই প্রত্যয়ের আর-এক দিক। কিন্তু উপস্থাপনার দোষে চরিত্রটি বিকশিত হয় নি পুরোপুরি। এটুকুই কেবল জানা যায় যে, স্থানীয় শ্রমিক-আন্দোলনের সে অন্যতম পুরোধা। মধ্যবিত্ত রোম্যান্টিসিজমের প্রতিতুলনায় সুশান্তর সংগ্রামী মানসিকতাকে যদি রাখতেন, পরবর্তী অসুবিধের হাত থেকে হয়তো রেহাই পেতেন ঋত্বিক।








