Sunday, January 18, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৬]



নাগরিকের কাহিনী ও বিস্তার 
............................................


ভাঙন ও অবক্ষয়ের মধ্যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার যে গতিটি 'নাগরিক'-এ বিধৃত, তা আমাদের স্পর্শ করে ঠিকই।

দীর্ঘদিন নিষ্ঠা সহকারে শিক্ষকতা করেছেন রামুর বাবা, তাঁর অবসরজীবনে গুরুতর আর্থিক সংকট। কদর্য সমাজব্যবস্থার অকৃতজ্ঞতায় ব্যথিত প্রৌঢ় মানুষটি পরিমণ্ডলের ওপর সমস্ত আস্থা হারিয়েছেন, আছে কেবল অবিমিশ্র নৈরাশ্য। চাকরী পাওয়া যে প্রায় লটারি জেতার সমান, এই কথায় জীবনযুদ্ধে অনভিজ্ঞ ছেলেকে তিনি কেবল নিরুৎসাহই করেন। অথচ যৌবনধর্মে আপ্লুত নায়ক রামু, সঙ্গী তার উদ্যম। বাবার নৈরাশ্য স্বভাবতই তার মনঃপূত নয়। নিজের খণ্ডিত উপলব্ধি আর আবেগের নিরিখে দুজনেই নিজেকে জাহির করে, ফলত উভয়ের মধ্যসৃষ্টি হয় ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।

অন্যদিকে, বিজ্ঞানের ছাত্র সাগর কাজ নিয়েছিল জাল ওষুধ তৈরির কারখানায়। নৈতিক বিচারে নিন্দনীয় এই জীবিকাই কিন্তু অর্থনৈতিক তাৎপর্যের গুরুত্বে সাগরকে দেয় বিশেষ সামাজিক মর্যাদা। পেয়িং গেষ্ট অনাত্মীয় এই যুবকটিই রামুদের সংসারে সম্মানের আসনটি দখল করে-রামু যে সম্মান থেকে বঞ্চিত, বেকারত্বের দায়ে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে তুচ্ছ রক্তের সম্পর্ক কিংবা নৈতিক বিচার।

অবক্ষয়কবলিত এই পরিবেশে নারী জীবনের দুর্দশার চার প্রতিনিধি-রামুর মা, বোন সীতা, প্রেমিকা উমা আর উমার বোন শেফালী।

অদূর-অতীতে আর্থিক স্বচ্ছলতার আস্বাদ পেয়েছিলেন রামুর মা, আজ যিনি সংসারের জোয়াল-কাঁধে ব্যতিব্যস্ত। অতীতের সুখস্মৃতি ঝাপসা হয়ে এলেও, তাকে আঁকড়ে রাখতে চান তিনি, নিষ্ঠুর বর্তমানকে সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।

মধ্যবিত্ত ঘরের আরো অনেক কুমারী মেয়ের মতোই তাঁর মেয়েটিকেও মেয়ে-দেখা নামক নিষ্ঠুর এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, আর বারবারই সহ্য করতে হয় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমান। বয়স বেড়েই চলে সীতার। ঘাটতি রূপের পসরায়, অভাব কাঞ্চনমূল্যের। হতাশা-বঞ্চনা-অপমান এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় সীতাকে, যখন সে নির্লজ্জের মতো আশ্রয় ভিক্ষা করে সাগরের কাছে, বিয়ের প্রস্তাবে। প্রেমের চেয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নই তখন জরুরী।উমার অবশ্য মর্যাদাহানিকর কোনে স্পষ্টভাষণের পথ নয়। কবে রামু চাকরী পেয়ে বিয়ে করবে তাকে, প্রতীক্ষায় যৌবন পার করে দেয়। তারও সংসারে অচল অবস্থা। বোন শেফালীর প্রায়-প্রকাশ্য গণিকাবৃত্তি, বাধা দিতে পারে না উমা-অর্থনৈতিক অনিবার্যতা। নিশ্চেষ্ট সে শুধু ভোগে মানসিক টানাপোড়েনে। ভাঙন রোধ করবে সক্রিয় প্রচেষ্টায়, এ-শক্তিও তার নেই। আছে শুধু দুর্বোধ্য এক নিস্পৃহভাব।অথচ শেফালী তো তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়েছে সচেতনভাবেই। সম্মানজনক কোন পেশায় নিযুক্ত হওয়ার মতো শিক্ষা বা ক্ষমতা তার নেই। নারীদেহটি মূলধন করেই পথে নামে সে-'খেতে হলে একটা কিছু করতে হবে তো।' হঠাৎ অল্প-পরিচিত এক পুরুষের ডাকে সে ঘর ছাড়ে বরাবরের মতোই।
-চারটি নারী, বস্তুত একই খাদক সংস্কৃতির চারটি শিকার।
আর এক বিকৃতি উমাদের নীচতলার এক কোণের ভাড়াটে যতীনবাবু। বেকার প্রৌঢ়। সাধ্য নেই, তবু সাধ রয়েছে প্রচুর। নানা ছুতোয় হাত পাতেন এর-তার কাছে। অথচ মধ্যবিত্তসুলভ আত্মসম্মানবোধও তাঁর প্রখর। সব পয়সাই 'ধার' নেন তিনি, 'শোধ' দিয়ে দেবেনই পরে কোন এক সময়ে!

রাজনৈতিক চেতনাবর্জিত, কূপমণ্ডুক এই চরিত্রগুলিকে তাদের বিবিধ দুর্বলতা নিয়ে উপস্থিত করে অবক্ষয়কবলিত, পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলেন ঋত্বিক। কোথাও তাকে সহনীয় করে তোলার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টাও তাঁর নেই। তবু, বিশেষ এক অসম্পূর্ণতাবশত ঘটনাটি হয়ে থাকে নিছক এক পরিবেশন (প্রেজেনটেনশান), কোন বিশ্লেষণের (এ্যানালিসিস) স্তরে পৌঁছয় না।

প্রত্যেক সামাজিক প্রক্রিয়ার মতো অবক্ষয় নামক এই ক্রমবর্ধমানব্যাধিটির পিছনেও যে আছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির ঘাতপ্রতিঘাত, সেগুলির উল্লেখ অস্পষ্ট বড়ো, সরাসরি পাদপ্রদীপের আলোয় তাদের নিয়ে আসেন নি ঋত্বিক। রামুদের অর্থনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিক অধোগতি-ভদ্রাসন বিক্রী করে তথাকথিত ভদ্রপাড়ায় ছোট বাসা ভাড়া নেওয়া, তারপর সেখান থেকেও চলে গিয়ে বস্তীবাড়িতে ওঠা-এর মধ্য দিয়ে ক্রমব্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংকটের মোটামুটি একটি পরিপ্রেক্ষিত আসে বটে। কিন্তু এতেই কি স্পষ্ট হয় যে সামাজিক প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল? 

এ ছবির শুরু বলিষ্ঠ এক পুরুষমূর্তির ঘর্মাক্ত কলেবর দেখিয়ে; অনবরত হাতুড়ি চালিয়ে চলেছে সে। ছবির শেষ হয় ওই একই প্রতীকের পুনরাবৃত্তিতে। ইতিমধ্যে ছবির নায়কের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমাদের, বোঝা গেছে পুরুষ মূর্তিটি এল রামুরই প্রতীক হয়ে, প্রতিকূল পরিবেশে অদম্য প্রত্যয়ই যার পাথেয়। মধ্যবর্তী আবর্তনের চক্রে ঘুরে  ফিরেই আসে প্রত্যয়ের দীপ্ত প্রকাশ। সুরটি অবশ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই রকম চড়াপর্দায় বাঁধা। রামু বারবার চিৎকার করে জানায় 'আমি মানি না, মানব না'। বৃদ্ধ বেহালাবাদকের তোলা অচেনা অথচ উদ্দীপনাময় এক সুর তার তন্ত্রীতে জাগায় অনুরণন, জোগায় অনুপ্রেরণা। প্রত্যয়ের সুর বাজে ছবিতে 'আন্তর্জাতিক'-এর একাধিক প্রয়োগে।

লক্ষণীয় রামুর উচ্চকণ্ঠ, বেহালার তান, 'আন্তর্জাতিক'-এর ছন্দ-ঘটনাবলীর সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র খুবই অস্পষ্ট। তবু নাটকীয়ভাবে এদের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আসলে প্রত্যয়ের এহেন অভিব্যক্তি, তার প্রতীকী ও ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ-এসবের মধ্য দিয়ে ঋত্বিক উদঘাটন করেন কেবল মধ্যবিত্তসুলভ রোম্যান্টিসিজম। সম্পূর্ণ আবেগনির্ভর এই মানসিকতার উৎস সন্ধানে যাওয়া বৃথা। কোন কোন শক্তি একে পুষ্ট করে, রক্ষা করে, সদুত্তর মিলবে না ও প্রশ্নেরও অথচ একেই ঋত্বিক ব্যবহার করতে চান পার্থিব কষ্টমোচনের হাতিয়ার হিসেবে।

রামুর বন্ধু সুশান্তর চরিত্রও এই প্রত্যয়ের আর-এক দিক। কিন্তু উপস্থাপনার দোষে চরিত্রটি বিকশিত হয় নি পুরোপুরি। এটুকুই কেবল জানা যায় যে, স্থানীয় শ্রমিক-আন্দোলনের সে অন্যতম পুরোধা। মধ্যবিত্ত রোম্যান্টিসিজমের প্রতিতুলনায় সুশান্তর সংগ্রামী মানসিকতাকে যদি রাখতেন, পরবর্তী অসুবিধের হাত থেকে হয়তো রেহাই পেতেন ঋত্বিক।



Thursday, January 15, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৫]


মন্দাক্রান্তা 



নাগরিক সিনেমাটিকে নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে কিছু তথ্য দিয়ে দিই ---

{ নাগরিক

প্রযোজনা: ফিল্ম গিল্ড, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিক ঘটক

কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ঋত্বিককুমার ঘটক

আলোকচিত্র: রামানন্দ সেনগুপ্ত

সম্পাদনা: রমেশ যোশী

সঙ্গীত: হরিপ্রসন্ন দাস

ধারাভাষ্য: ঋত্বিককুমার ঘটক

অভিনয়: প্রভা দেবী, শোভা সেন, কেতকী চ্যাটার্জি, গীতা সোম, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য, অজিত ব্যানার্জি, কালী ব্যানার্জি, কেষ্ট মুখার্জি, গঙ্গাপদ বসু, শ্রীমান পিন্টু, পারিজাত বোস, মমতাজ আহমেদ খান,  অনিল চট্টোপাধ্যায়, উমানাথ ভট্টাচার্য, অনিল ঘোষ, কানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

মুক্তির তারিখ: ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭

প্রেক্ষাগৃহ: নিউ এম্পায়ার }


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তজীবনের ভাঙনের ছবি 'নাগরিক'। মুখ্য হলেও, এ ছবির সামগ্রিক পরিচয় কিন্তু এটাই নয়। উপেক্ষা করা যায় না ছবির গৌণ দিকটিকেও-বর্তমানের ভয়াবহতাকে স্বীকার করার পরও সমস্ত ছবিটি জুড়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুর্নিবার এক প্রত্যয়ের সুর। আলংকারিক অর্থে তো বটেই, আক্ষরিক অর্থেও। বিপ্রতীপ এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব মুহুর্মুহু দর্শকের চেতনায় আঘাত করে তাকে সচেতন থাকতে বাধ্য করে।

মা বাবা দুই ছেলে এক মেয়ে-এই পাঁচজনকে নিয়ে নাগরিক-এর পরিবার। এরা পূর্ববাংলা থেকে আগত উদ্বান্ত নয়; না হলেও, শিক্ষকতা থেকে বাবা সুরেশ বাগচী অবসর নিলে, শ্যামপুকুরের বড়ো বাড়ি ছেড়ে তাদের উঠে আসতে হয়েছে কলকাতার এক ঘিঞ্জি পাড়ায়, চার পাশ চাপা স্যাঁতসেতে একটা বাড়িতে। বড়ো ছেলে রাম্ সাবালক হলেও স্বাবলম্বী নয়, এখনও বেকার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ডামাডোলে চাকরি জোটানো মুখের কথা নয়। বাবার পেনশনটুকুই পরিবারের ভরসা-ওই যৎসামান্য আয়ে কায়ক্লেশে গ্রাসাচ্ছাদন যদিও বা হয়, সুস্থভাবে বেঁচে জীবনটাকে আরেকটু বর্ণময়, উপভোগ্য করে তোলা অসম্ভব। সৎ আদর্শবাদী পিতা জীবনের প্রান্তে বসে ভাবেন, এ আমরা কোথায় এলাম: 'আমাদের বাংলা ছিল গড়া বাংলা। আজকের বাংলা হচ্ছে ভাঙা বাংলা।... একটা পুরোনো দালানের মতো দেশটা ভেঙে পড়ছে।'

 হেঁশেল ঠেলে ঘরদোর সামলিয়ে মা'র দিন যায়; ফেলে-আসা বাড়ির জন্যে আক্ষেপ তাঁর ঘোচবার নয়: 'বাড়িটা যেন হাড়েপাঁজরায় মিশে আছে।' হাঁপ-ধরা সংকীর্ণ পরিবেশে মা'র মতো রামুর মনও ঘুলিয়ে ওঠে, মুক্তির স্বপ্ন দেখে সে। সেই-স্বপ্নের বিশ্বাস্য চিত্ররূপ সে খুঁজে পেয়েছে নোনা-ধরা দেয়ালে টাঙানো পুরোনো একটা ক্যালেন্ডারের ছবিতে: তাতে আঁকা, দিগন্তলীন মাঠের মাঝখানে একখানা লাল টালির বাংলো। রামু নিত্য নিজেকে স্তোক জোগায়, আর কয়েকদিনের ভেতরেই সে চাকরি পাবে-পেলেই, প্রেমিকা উমাকে বিয়ে করে অমনই এক খোলামেলা জায়গায় ঘর পাতবে দুজনে; রূপকথার শেষে যেমন হয়, 'অতঃপর তাঁহারা সুখে-শান্তিতে রাজত্ব করিতে লাগিলেন', তেমনিভাবে 'করিতে লাগিলেন'-এর মতো নিরন্তরতাবোধক স্বস্তিদায়ক যৌগিক ক্রিয়ার আবেষ্টনে গুছিয়ে নেবে সাধের সংসার। রামুর এই সুখকল্পনা সম্পর্কে নাগরিক-এর প্রচারপুস্তিকায় ঋত্বিক লিখেছিলেন: 'রামুর। চোখে স্বপ্ন... একটি নীড় বেঁধে উমার সঙ্গে তার দিন কাটবে মন্দাক্রান্ত তালে।"

'মন্দাক্রান্তা': শব্দটি নাগরিকের সঙ্গে 'মেঘদূত'-এর, রামুর সঙ্গে ঋত্বিকের অন্যান্য যক্ষসদৃশ নায়কদের আত্মীয়বন্ধন নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয়। ১৯৪৭-এ প্রকাশিত 'এক্সট্যাসি' গল্পের ক্লান্ত তিক্ত প্রাক্তন দেশকর্মী, মধ্যপ্রদেশের জংলা রুক্ষ প্রকৃতি আর গভীর নীল আকাশের কাছাকাছি পালিয়ে যায়; নির্জন প্রান্তরে শুয়ে-বসে ধীরে-সুস্থে বাকি কটা দিন কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার। সে ভাবে: 'না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরা, কিছু না বুঝে ছুরি খেয়ে শেষ হওয়া, বীভৎসতা আর দৈনন্দিন জীবনের শত-সহস্র বেদনা, এবং তারই পাশে ধনিকের টাকার জোরে সমগ্র শাসন-যন্ত্রটাকে হাতে ক'রে উল্লসিত উদ্দাম পৈশাচিকতা, এর বিরুদ্ধে আমি কি করতে পারি?... তার চেয়ে এই ভালো।...কি ভালো যে লাগছে, বলতে পারি না। এ সেই কালিদাসের মেঘদূতের দেশ, আমাদের অলকার দেশ।' যদিও সে জানে বনে-বনান্তরে যে রস ক্ষরিত হচ্ছে তাতে  লীন হলে পাগল হয়ে যাবে তবু ওখানেই রয়ে যেতে বদ্ধপরিকর সে। তার যাই হোক, একসময় কি রামুর অসহ্য লাগবে না ও-আত্মরতি, 'আকাশগঙ্গার স্রোত ধরে' গল্পের নায়কের মতন তাকেও কি শুনতে হবে না কথকের সেই ধিক্কার: 'গর্দভ।'



ছবিঋন: গুগল


Sunday, January 4, 2026

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা |প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য
নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৪]


ইতিহাসের হাত ধরে 
.................................

একজন সাতাশ বছরের যুবক প্রথম যে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন, তার নাম নাগরিক। সাল ১৯৫২। ঠিক সাতাশ বছর আগে, ১৯২৫ সালের ৪ ঠা নভেম্বর ঋত্বিকের জন্ম, বাংলাদেশের রাজশাহী শহরের মিঞা পাড়ায়। এ বছরেই ২৭ বছর বয়সে সের্গেই আইজেনস্টাইন নির্মাণ করছেন ১৯০৫ সালে রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনের ক্রুরাতাদের অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় সংঘটিত বিদ্রোহের একটি নাটকীয় চিত্রায়ণ। যে ধ্রুপদী ছবিটি ঋত্বিকের সমবয়সী। তাই হয়তো ওডেসা সিঁড়ির বৃত্তান্তের মতোই তাঁরও জীবনবৃত্তান্তে রক্ত ও স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

১৯৫২ সালে গোটা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়,কিকুয়ু উপজাতির নেতা জোমো কেনিয়াট্টা কেনিয়া থেকে শ্বেতাঙ্গ বিতাড়নের জন্য মাউ মাউদের সংগঠিত করলে ব্রিটেন মাউ মাউ দমনের জন্য সৈন্য পাঠায়।  আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী রচনা করেন এই বছরেই। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়। বাঙালি জীবনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ। ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউরসহ কয়েকজন শহীদ হন। এই ঘটনাটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। 
পাশাপশি বাংলা চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এই বছরেই " বসু পরিবার" সিনেমার হাত ধরে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন সুপ্রিয়া দেবী। যিনি ঠিক আট বছর পর, ঋত্বিকের প্রিয় ও প্রধান নারী চরিত্র, নীতা হয়ে, মেঘে ঢাকা তারার মতো কাল্ট ফিল্মের মাধ্যমে নিজের অভিনয় প্রতিভাকে  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটের হাত ধরেই চলে আসি, ঋত্বিকের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, নাগরিকে।




Sunday, December 28, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৩]


কাঁটাতার ও দেশভাগ
...................................


ওপরের প্রেক্ষাপটটি এই ছবি তৈরির নেপথ্য সত্য হলেও এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলে, ঋত্বিক কুমার ঘটকের প্রথম তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা " নাগরিক" নিয়ে আমার অনুভূতি ও ভাবনা চিন্তার কথা আলোচনা করবো। 

মানুষের অবয়বে মানুষ হাঁটছে। মানুষের প্রথম চলার ইতিহাস আনুমানিক, অর্থাৎ মানুষের চেতনঋদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস অনেকটা প্রচারনির্ভর। সেখানে বিভিন্ন সময়ের সেলিব্রিটিদের ভিড়। রাজা রাজড়া আমির ওমরাহ বাদশাহ নবাব সম্রাট প্রভূত রহিস ব্যক্তিত্বের ভিড়। ইতিহাসের চোখ, আইনের ন্যায়দণ্ড হাতে দাঁড়ানো চোখবাঁধা চরিত্রটির মতো অসহায়। কালো কাপড় যেন প্রতীকী। অনেকটা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে 
 না'র মতো। ইতিহাস তাঁদেরই গুরুত্ব দেয়, যারা সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে প্রচারের লাইম লাইটে ওপরের সারিতে এসে দাঁড়ায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হয়ে কলম ধরেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক শিল্পী ঔপন্যাসিক চলচ্চিত্র পরিচালক। কিন্তু কেউই  ঋত্বিক ঘটকের মতো সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে , রাজনৈতিক দুরূহ অভিসন্ধির শিকার 
 স্বাধীনোওর এই একাগ্র বাংলার বিক্ষত দেশ হারানো হাজার লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের রাতারাতি জীবনের গূঢ় শিকড় ছেঁড়া আর্তনাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি। আবেগপ্রবণ অত্যন্ত সংবেদনশীল সৎ ও ঋজু  মানুষটির সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে বাঙালির অস্মিতা এবং গহন সংস্কৃতির ঐতিহ্য যা একান্তই দেশজ, যা কৃত্রিম শিক্ষার ড্রয়িংরুমে সাজানো বিলাসবহুল চর্যার নিরক্ত করবীর অন্তঃসারশূন্য বিলাপ নয়। এরফলে নানাবিধ বাহ্য প্রলোভন ও সামাজিক সাফল্যের সুযোগ পেয়েও তিনি স্বজাতির হাত কখনোই ছাড়েন নি।

তিনি সিনেমাকে কেবল নিছক বিনোদন, আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তির উপায় কিংবা ধনী রাষ্ট্রে নিজেদের বিপন্ন বিস্ময় আর দারিদ্র্য বেচার কৌশল মনে করেন নি। প্রথম থেকেই তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনার মূল কাঠামো বা ফোকাস একই ছিল, কিন্তু নিজের involvement বা ভাবনার সঙ্গে নিজের সমস্তটাকে এমন ভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন যে জীবনে এসেছে চরম বিড়ম্বনা এবং বিশৃঙ্খল ভাঙনের ক্ষয়। একদিকে চেনা মানুষের বা নিজের  রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে, যে সমস্ত দলীয় সহকর্মী দলের কাছের দূরের  চেনা মুখগুলো, একটু একটু করে পাথুরে মুখোশে বদলে গিয়েছিল, বৃহত্তর স্বার্থকে উপেক্ষা করে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে চরিতার্থ করার অদম্য বাসনায়। তারাই বিশেষ করে ঋত্বিকের স্বপ্নে, ভাবনায়, দেশভাগের কাঁটাতারের চেয়েও আরও গভীর যন্ত্রণায় বুকে বিঁধে গিয়েছিল।রাজনৈতিক দৃঢ় বিশ্বাসে যে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন, ছিন্নমূল মানুষের যে আশা যে গণচেতনা ও গণসংহতি, একক ভাবে বিছিন্ন না হয়ে সামগ্রিক শক্তির উত্থানের কথা ভাবতেন ঋত্বিক, স্বপ্ন দেখতেন নারীর অপরাজেয় শক্তির, নারীর কমনীয়তা সহিষ্ণুতা এবং প্রয়োজনে চূড়ান্ত লড়াকু, একদিকে মা,অন্যদিকে বিক্ষত আপনের ক্ষতের প্রলেপ ভেবে ,এই সর্বংসহা অথচ অনমনীয় নারীর লড়াইয়ে যে মুক্তি তাও যখন বিপন্ন সময় ও বদলে যাওয়া লোভী মানুষের সমীকরণে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছিল সুদৃঢ় শিকড়ের প্রত্যয়, তখন সেই আঘাতের তীব্রতা আজীবন আর সহ্য করতে পারেন নি ঋত্বিক। ভেঙে গিয়েছিল মর্মন্তুদ যন্ত্রণায় তাঁর শরীর, মন, তাঁর আশা স্বপ্ন সবকিছু। তবুও নিবিড়ে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, এবং অশোষহীন লড়াইয়ের অঙ্গার,জীবনপণ করে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে। তারাই ছিলো তাঁর ভাবনার কথক, তাঁর নিজস্ব লড়াইয়ের সুপ্ত বারুদ। একদিকে ক্রমশ একা হয়ে পড়া,  আদর্শবাদী একজন প্রখর ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে লোভী, চূড়ান্ত স্বার্থপর দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের অগণনীয় ভণ্ড মানুষের স্খলিত বিবেক তাঁকে অভিমানী করে তুলেছিল। সমস্ত ব্যাপারেই মেনে নেওয়া। শুধুই আপোষ। ভেড়ার পালের মতো অন্ধ অনুগামী এক অনড় সিস্টেম। বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো এ কারণেই ক্রমশ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়।  আপাতভাবে যে মানুষটা একদিন মারা গিয়েছিলেন, তার  প্রস্তুতি চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জীবনভর দেশভাগের যন্ত্রণা ও বাঙালির স্বখাত সলিলে নিমজ্জিত হবার শিকড় চ্যুতি তাঁর চিরকালীন প্রতিবাদ হয়েই রইলো!


Sunday, December 21, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ২]


প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট 
..............................

মেঘে ঢাকা তারা,কোমলগান্ধার,সুবর্ণরেখা এই দেশভাগত্রয়ীর বেশ আগে ১৯৫১-৫২য় ঋত্বিকের হাতেখড়ি নাগরিক তাঁর প্রথম ছবি, আধুনিক বাংলার দুর্যোগ বিষয়ে প্রথম বিবৃতি। প্রসঙ্গের ঐক্য সত্ত্বেও আঙ্গিকের বিচারে নাগরিক-এর সঙ্গে পরের তিনটি ছবির পার্থক্য অনেক। তা-ও আখ্যানবস্তু আর আখ্যানযুক্তির যে-সংশ্লেষ ঋত্বিক একদিন ঘটাবেন, তার কয়েকটি আগাম লক্ষণ নাগরিক-এ আছে: আর কিছু না হোক, গোড়াপত্তনের ধরন থেকে পরবর্তী বিকাশের আঁচ নিশ্চয়ই মেলে।


১৯৫০ সালে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে ঋত্বিক যুক্ত হন চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তবে 'সিনেমা' সম্পর্কে আগ্রহের সূচনা কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিলগ্নের দিনগুলোতে। ঋত্বিকের মেজদা 'নিউ থিয়েটার্সে'র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্যামেরাম্যান হিসেবে, স্ট্রিট সিঙ্গার ছবিতেও তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁরই সুবাদে প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে বিমল রায় পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতের অনেকেরই তাঁদের বাড়িতে আসাযাওয়া ছিল। এঁদের আড্ডা; ছবি নিয়ে আলোচনা কিশোর ঋত্বিককে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো, তবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করার কোন সচেতন ভাবনা তখনো মনে জাগেনি।

চলচ্চিত্রকার ঋত্বিকের জীবন শুরু হয় বিমল রায়ের কাছে-তাঁর ছবির মুখ্য সহকারী ও কাহিনীকার হিসেবে। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর আত্মপ্রকাশ কিন্তু ১৯৫১ থেকে ৫২ সালের মধ্যে নির্মিত বেদেনী। অরূপকথা ছবিতে। এখানে তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। ছবিটি অবশ্য নানাকারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর পর একে একে সৃষ্ট হয় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বহনকারী অনবদ্য ছবিগুলো, যদিও সমসময়ে তা ঋত্বিককে বিশেষ কোন সাফল্যের মুখ দেখাতে পারেনি। আমাদের দুর্ভাগা দেশে চলচ্চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাও এর একটা বড় কারণ। ঋত্বিক তাঁর মননে মেধায় সময়ের থেকে অনেক এগিয়েছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। যাই হোক মুখে তিনি যতই বলুন না যে চলচ্চিত্র প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে তাঁর কাছে অপরিহার্য বা শ্রেষ্ঠতম নয় তবু আমৃত্যু চলচ্চিত্রকে তিনি ছেড়ে যেতে পারেননি। "ছবি না করে তো বাঁচতে পারি না.... কাজেই এই ছবিই করি, আর কিছু না।"

ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি তাকিয়েছেন মানুষের দিকেই-"তাৎক্ষণিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কোনদিকে যাচ্ছে সেটার দিকে তাকাই এবং টু দি বেস্ট অব মাই এবিলিটি সেটা আমি বলার চেষ্টা করি।"

পরের ছবি নাগরিক (১৯৫২-৫৩)-কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ঋত্বিককুমার ঘটক। যে ফিল্ম গিল্ডের ব্যানারে ছবিটি তৈরি হয়েছিল, তার তিনজন সংগঠক ছিলেন-প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিককুমার ঘটক। এই দুজনই ঋত্বিকের প্রতি গভীর ভালবাসা ও অন্তরের টানেই এগিয়ে এসেছিলেন। বাড়ী মর্টগেজ রেখে টাকা দিয়েছিলেন ভূপতি নন্দী। এঁরা ছাড়াও দারোয়ান, ছুতোর কেষ্ট রায়, বহু সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। কারণ-"সমস্ত থিমটাই ছিল বাস্তবজীবনের সুখেদুঃখে গাঁথা। তাই নাগরিক হয়ে ওঠে পিপলস্ আর্ট" (দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)।

ভূপতি নন্দীর সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের আলাপ মৃণাল সেনের মাধ্যমে ১৯৪৮-৪৯ সালে। এই আলাপ ক্রমে প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।-"ক্রমে ক্রমে দেখলাম যে মৃণালের চেয়েও ঋত্বিকের উপর আমার আস্থা বাড়ছে।... গণনাট্য সঙ্ঘের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে ঋত্বিকের শিল্পগত সৃষ্টির ধ্যানধারণা এবং স্বপ্নের অনেক মিল আমি খুঁজে পেলাম,... বক্তব্য যদি কবিতার মাধ্যমে, গানের মাধ্যমে, নাটকের মাধ্যমে বা আরো নানা মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়; তবে সেটা সেভাবেই ত ব্যবহার করা উচিত -এই কথাই ঋত্বিক মাঝে মাঝে আমাকে বলত,... অর্থাৎ ফিল্ম সম্বন্ধে ঋত্বিকের এই মুক্ত মন আমাকে চমৎকৃত করেছিল।"

ঋত্বিক যখন নাগরিক করার কথা ভাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই ভূপতি নন্দী এগিয়ে এসেছিলেন-অর্থের লোভে নয়, সম্পূর্ণ আদর্শের টানে। যে টাকা তিনি দিয়েছিলেন তা তিনি ফেরৎ পাননি কোনদিন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশও করেননি। ক্ষোভ একটাই যে অতি সামান্য কারণে, হয়তো কোন সামান্য ভুলের জন্য ছবিটা মুক্তিলাভ করেনি এবং বাক্সবন্দী থেকেই সেটা নষ্ট হয়ে গেল। নির্দ্বিধায় তিনি একথাও বলেছেন-"আমার এইটুকুই আনন্দ যে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিতান্তই ঘটনাচক্রে আমার নাম জড়িত হয়ে পড়েছে।” এই ঘটনাগুলো আমাদের অন্তত এটুকু বুঝতে সাহায্য করে যে ঋত্বিকের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আদর্শের দৃঢ়তা, সৎ ও স্বার্থনিরপেক্ষ চিন্তা ছবির বাইরের মানুষকেও এভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে, আকর্ষণ করেছে।

পরিচালকের জীবদ্দশায় এ-ছবি মুক্তিলাভ করেনি। জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সম্পূর্ণ এই ছবি তাঁর মৃত্যুর দেড় বছর পরে ১৯৭৭ সালে কলকাতার, দর্শক দেখতে পান। ততদিনে ছবিটিও সম্যক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃতপ্রায়।  শ্রী ব্রম্ভা সিং ও শ্রী রমেশ যোশী ফিল্মটির একটি প্রিন্ট উদ্ধার করেন বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরি থেকে। মূল নেগেটিভটি হারিয়ে গেছে। সময়ের ক্ষতচিহ্ন (এই প্রিন্টটা ১৯৫৩য় করা গুটিকতকের একটি) ছিল এর সর্বাঙ্গেই প্রায়। পুনা এন. এফ. এ. আই-এর কিউরেটর শ্রী পি. কে. নায়ার ছবিটির প্রিন্ট এবং একটি ডুপলিকেট নেগেটিভ তৈরি করেন ১৯৭৭ সনে। ছবিটি ২৫ বছর পরে মুক্তি পায়। তবে ১৯৫৩ সাল নাগাদ হাওড়া জেলার একটি মফস্বল প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি কয়েকদিন চলে এবং আইনগত কারণে প্রদর্শন বন্ধও হয়ে যায়।)