Sunday, December 28, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ৩]


কাঁটাতার ও দেশভাগ
...................................


ওপরের প্রেক্ষাপটটি এই ছবি তৈরির নেপথ্য সত্য হলেও এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলে, ঋত্বিক কুমার ঘটকের প্রথম তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা " নাগরিক" নিয়ে আমার অনুভূতি ও ভাবনা চিন্তার কথা আলোচনা করবো। 

মানুষের অবয়বে মানুষ হাঁটছে। মানুষের প্রথম চলার ইতিহাস আনুমানিক, অর্থাৎ মানুষের চেতনঋদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস অনেকটা প্রচারনির্ভর। সেখানে বিভিন্ন সময়ের সেলিব্রিটিদের ভিড়। রাজা রাজড়া আমির ওমরাহ বাদশাহ নবাব সম্রাট প্রভূত রহিস ব্যক্তিত্বের ভিড়। ইতিহাসের চোখ, আইনের ন্যায়দণ্ড হাতে দাঁড়ানো চোখবাঁধা চরিত্রটির মতো অসহায়। কালো কাপড় যেন প্রতীকী। অনেকটা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে 
 না'র মতো। ইতিহাস তাঁদেরই গুরুত্ব দেয়, যারা সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে প্রচারের লাইম লাইটে ওপরের সারিতে এসে দাঁড়ায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হয়ে কলম ধরেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক শিল্পী ঔপন্যাসিক চলচ্চিত্র পরিচালক। কিন্তু কেউই  ঋত্বিক ঘটকের মতো সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে , রাজনৈতিক দুরূহ অভিসন্ধির শিকার 
 স্বাধীনোওর এই একাগ্র বাংলার বিক্ষত দেশ হারানো হাজার লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের রাতারাতি জীবনের গূঢ় শিকড় ছেঁড়া আর্তনাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি। আবেগপ্রবণ অত্যন্ত সংবেদনশীল সৎ ও ঋজু  মানুষটির সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে বাঙালির অস্মিতা এবং গহন সংস্কৃতির ঐতিহ্য যা একান্তই দেশজ, যা কৃত্রিম শিক্ষার ড্রয়িংরুমে সাজানো বিলাসবহুল চর্যার নিরক্ত করবীর অন্তঃসারশূন্য বিলাপ নয়। এরফলে নানাবিধ বাহ্য প্রলোভন ও সামাজিক সাফল্যের সুযোগ পেয়েও তিনি স্বজাতির হাত কখনোই ছাড়েন নি।

তিনি সিনেমাকে কেবল নিছক বিনোদন, আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তির উপায় কিংবা ধনী রাষ্ট্রে নিজেদের বিপন্ন বিস্ময় আর দারিদ্র্য বেচার কৌশল মনে করেন নি। প্রথম থেকেই তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনার মূল কাঠামো বা ফোকাস একই ছিল, কিন্তু নিজের involvement বা ভাবনার সঙ্গে নিজের সমস্তটাকে এমন ভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন যে জীবনে এসেছে চরম বিড়ম্বনা এবং বিশৃঙ্খল ভাঙনের ক্ষয়। একদিকে চেনা মানুষের বা নিজের  রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে, যে সমস্ত দলীয় সহকর্মী দলের কাছের দূরের  চেনা মুখগুলো, একটু একটু করে পাথুরে মুখোশে বদলে গিয়েছিল, বৃহত্তর স্বার্থকে উপেক্ষা করে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে চরিতার্থ করার অদম্য বাসনায়। তারাই বিশেষ করে ঋত্বিকের স্বপ্নে, ভাবনায়, দেশভাগের কাঁটাতারের চেয়েও আরও গভীর যন্ত্রণায় বুকে বিঁধে গিয়েছিল।রাজনৈতিক দৃঢ় বিশ্বাসে যে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন, ছিন্নমূল মানুষের যে আশা যে গণচেতনা ও গণসংহতি, একক ভাবে বিছিন্ন না হয়ে সামগ্রিক শক্তির উত্থানের কথা ভাবতেন ঋত্বিক, স্বপ্ন দেখতেন নারীর অপরাজেয় শক্তির, নারীর কমনীয়তা সহিষ্ণুতা এবং প্রয়োজনে চূড়ান্ত লড়াকু, একদিকে মা,অন্যদিকে বিক্ষত আপনের ক্ষতের প্রলেপ ভেবে ,এই সর্বংসহা অথচ অনমনীয় নারীর লড়াইয়ে যে মুক্তি তাও যখন বিপন্ন সময় ও বদলে যাওয়া লোভী মানুষের সমীকরণে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছিল সুদৃঢ় শিকড়ের প্রত্যয়, তখন সেই আঘাতের তীব্রতা আজীবন আর সহ্য করতে পারেন নি ঋত্বিক। ভেঙে গিয়েছিল মর্মন্তুদ যন্ত্রণায় তাঁর শরীর, মন, তাঁর আশা স্বপ্ন সবকিছু। তবুও নিবিড়ে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, এবং অশোষহীন লড়াইয়ের অঙ্গার,জীবনপণ করে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে। তারাই ছিলো তাঁর ভাবনার কথক, তাঁর নিজস্ব লড়াইয়ের সুপ্ত বারুদ। একদিকে ক্রমশ একা হয়ে পড়া,  আদর্শবাদী একজন প্রখর ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে লোভী, চূড়ান্ত স্বার্থপর দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের অগণনীয় ভণ্ড মানুষের স্খলিত বিবেক তাঁকে অভিমানী করে তুলেছিল। সমস্ত ব্যাপারেই মেনে নেওয়া। শুধুই আপোষ। ভেড়ার পালের মতো অন্ধ অনুগামী এক অনড় সিস্টেম। বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো এ কারণেই ক্রমশ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়।  আপাতভাবে যে মানুষটা একদিন মারা গিয়েছিলেন, তার  প্রস্তুতি চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জীবনভর দেশভাগের যন্ত্রণা ও বাঙালির স্বখাত সলিলে নিমজ্জিত হবার শিকড় চ্যুতি তাঁর চিরকালীন প্রতিবাদ হয়েই রইলো!


Sunday, December 21, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ২]


প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট 
..............................

মেঘে ঢাকা তারা,কোমলগান্ধার,সুবর্ণরেখা এই দেশভাগত্রয়ীর বেশ আগে ১৯৫১-৫২য় ঋত্বিকের হাতেখড়ি নাগরিক তাঁর প্রথম ছবি, আধুনিক বাংলার দুর্যোগ বিষয়ে প্রথম বিবৃতি। প্রসঙ্গের ঐক্য সত্ত্বেও আঙ্গিকের বিচারে নাগরিক-এর সঙ্গে পরের তিনটি ছবির পার্থক্য অনেক। তা-ও আখ্যানবস্তু আর আখ্যানযুক্তির যে-সংশ্লেষ ঋত্বিক একদিন ঘটাবেন, তার কয়েকটি আগাম লক্ষণ নাগরিক-এ আছে: আর কিছু না হোক, গোড়াপত্তনের ধরন থেকে পরবর্তী বিকাশের আঁচ নিশ্চয়ই মেলে।


১৯৫০ সালে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে ঋত্বিক যুক্ত হন চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তবে 'সিনেমা' সম্পর্কে আগ্রহের সূচনা কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিলগ্নের দিনগুলোতে। ঋত্বিকের মেজদা 'নিউ থিয়েটার্সে'র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্যামেরাম্যান হিসেবে, স্ট্রিট সিঙ্গার ছবিতেও তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁরই সুবাদে প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে বিমল রায় পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতের অনেকেরই তাঁদের বাড়িতে আসাযাওয়া ছিল। এঁদের আড্ডা; ছবি নিয়ে আলোচনা কিশোর ঋত্বিককে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো, তবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করার কোন সচেতন ভাবনা তখনো মনে জাগেনি।

চলচ্চিত্রকার ঋত্বিকের জীবন শুরু হয় বিমল রায়ের কাছে-তাঁর ছবির মুখ্য সহকারী ও কাহিনীকার হিসেবে। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর আত্মপ্রকাশ কিন্তু ১৯৫১ থেকে ৫২ সালের মধ্যে নির্মিত বেদেনী। অরূপকথা ছবিতে। এখানে তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। ছবিটি অবশ্য নানাকারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর পর একে একে সৃষ্ট হয় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বহনকারী অনবদ্য ছবিগুলো, যদিও সমসময়ে তা ঋত্বিককে বিশেষ কোন সাফল্যের মুখ দেখাতে পারেনি। আমাদের দুর্ভাগা দেশে চলচ্চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাও এর একটা বড় কারণ। ঋত্বিক তাঁর মননে মেধায় সময়ের থেকে অনেক এগিয়েছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। যাই হোক মুখে তিনি যতই বলুন না যে চলচ্চিত্র প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে তাঁর কাছে অপরিহার্য বা শ্রেষ্ঠতম নয় তবু আমৃত্যু চলচ্চিত্রকে তিনি ছেড়ে যেতে পারেননি। "ছবি না করে তো বাঁচতে পারি না.... কাজেই এই ছবিই করি, আর কিছু না।"

ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি তাকিয়েছেন মানুষের দিকেই-"তাৎক্ষণিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কোনদিকে যাচ্ছে সেটার দিকে তাকাই এবং টু দি বেস্ট অব মাই এবিলিটি সেটা আমি বলার চেষ্টা করি।"

পরের ছবি নাগরিক (১৯৫২-৫৩)-কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ঋত্বিককুমার ঘটক। যে ফিল্ম গিল্ডের ব্যানারে ছবিটি তৈরি হয়েছিল, তার তিনজন সংগঠক ছিলেন-প্রমোদ সেনগুপ্ত, ভূপতি নন্দী ও ঋত্বিককুমার ঘটক। এই দুজনই ঋত্বিকের প্রতি গভীর ভালবাসা ও অন্তরের টানেই এগিয়ে এসেছিলেন। বাড়ী মর্টগেজ রেখে টাকা দিয়েছিলেন ভূপতি নন্দী। এঁরা ছাড়াও দারোয়ান, ছুতোর কেষ্ট রায়, বহু সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। কারণ-"সমস্ত থিমটাই ছিল বাস্তবজীবনের সুখেদুঃখে গাঁথা। তাই নাগরিক হয়ে ওঠে পিপলস্ আর্ট" (দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)।

ভূপতি নন্দীর সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের আলাপ মৃণাল সেনের মাধ্যমে ১৯৪৮-৪৯ সালে। এই আলাপ ক্রমে প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।-"ক্রমে ক্রমে দেখলাম যে মৃণালের চেয়েও ঋত্বিকের উপর আমার আস্থা বাড়ছে।... গণনাট্য সঙ্ঘের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে ঋত্বিকের শিল্পগত সৃষ্টির ধ্যানধারণা এবং স্বপ্নের অনেক মিল আমি খুঁজে পেলাম,... বক্তব্য যদি কবিতার মাধ্যমে, গানের মাধ্যমে, নাটকের মাধ্যমে বা আরো নানা মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়; তবে সেটা সেভাবেই ত ব্যবহার করা উচিত -এই কথাই ঋত্বিক মাঝে মাঝে আমাকে বলত,... অর্থাৎ ফিল্ম সম্বন্ধে ঋত্বিকের এই মুক্ত মন আমাকে চমৎকৃত করেছিল।"

ঋত্বিক যখন নাগরিক করার কথা ভাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই ভূপতি নন্দী এগিয়ে এসেছিলেন-অর্থের লোভে নয়, সম্পূর্ণ আদর্শের টানে। যে টাকা তিনি দিয়েছিলেন তা তিনি ফেরৎ পাননি কোনদিন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশও করেননি। ক্ষোভ একটাই যে অতি সামান্য কারণে, হয়তো কোন সামান্য ভুলের জন্য ছবিটা মুক্তিলাভ করেনি এবং বাক্সবন্দী থেকেই সেটা নষ্ট হয়ে গেল। নির্দ্বিধায় তিনি একথাও বলেছেন-"আমার এইটুকুই আনন্দ যে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিতান্তই ঘটনাচক্রে আমার নাম জড়িত হয়ে পড়েছে।” এই ঘটনাগুলো আমাদের অন্তত এটুকু বুঝতে সাহায্য করে যে ঋত্বিকের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আদর্শের দৃঢ়তা, সৎ ও স্বার্থনিরপেক্ষ চিন্তা ছবির বাইরের মানুষকেও এভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে, আকর্ষণ করেছে।

পরিচালকের জীবদ্দশায় এ-ছবি মুক্তিলাভ করেনি। জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সম্পূর্ণ এই ছবি তাঁর মৃত্যুর দেড় বছর পরে ১৯৭৭ সালে কলকাতার, দর্শক দেখতে পান। ততদিনে ছবিটিও সম্যক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃতপ্রায়।  শ্রী ব্রম্ভা সিং ও শ্রী রমেশ যোশী ফিল্মটির একটি প্রিন্ট উদ্ধার করেন বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরি থেকে। মূল নেগেটিভটি হারিয়ে গেছে। সময়ের ক্ষতচিহ্ন (এই প্রিন্টটা ১৯৫৩য় করা গুটিকতকের একটি) ছিল এর সর্বাঙ্গেই প্রায়। পুনা এন. এফ. এ. আই-এর কিউরেটর শ্রী পি. কে. নায়ার ছবিটির প্রিন্ট এবং একটি ডুপলিকেট নেগেটিভ তৈরি করেন ১৯৭৭ সনে। ছবিটি ২৫ বছর পরে মুক্তি পায়। তবে ১৯৫৩ সাল নাগাদ হাওড়া জেলার একটি মফস্বল প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি কয়েকদিন চলে এবং আইনগত কারণে প্রদর্শন বন্ধও হয়ে যায়।)



Tuesday, December 16, 2025

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্য | নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || প্রদীপ  চক্রবর্তীর গদ্য

নিঃসঙ্গ ছায়ানটের শতবর্ষ [ পর্ব: ১]



(বিশেষ দ্রষ্টব্য --- সমকালীন সময়ের নিরিখে দাঁড়িয়ে, শ্রদ্ধেয় ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে এবং তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত এবং মুক্তিপ্রাপ্ত নয় এমন চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, নাটক, ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের আনখশিখর অস্তিত্ব নিয়েই আমরা সংকটে পড়ি। উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদেরই ওপরে বর্তায় এই দায়। কারণ জীবিতঅবস্থায় আমরা ঋত্বিকের গভীর উপলব্ধি, দর্শন যেমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিয়েছি, ভয়ে ও স্বভাব দোষে, যার ফলশ্রুতি  ধীরে ধীরে আত্মধ্বংসের প্রস্তুতি যার মূলে অনেকাংশে আমরাই দায়ী, তাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা আজ আর নেই। তাঁর জীবন ও মৃত্যু দুটো অর্ধ শতাব্দীর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশ বছরের স্বল্প জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে দেশভাগ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ে যে ক্ষয় ও পচন তা তাঁকে ভাবিয়েছে, তীব্র কষ্ট দিয়েছে। 
নীলকন্ঠের মতো একাই সেই গরল পান করে ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হয়েছেন। নানাকরণবশত তাঁর প্রথম ছবি থেকে শেষ ছবি পর্যন্ত অনেক ছবিই ঠিক সময়ে মুক্তি পায় নি। তিনি অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত, অস্থিরচিত্ত, প্রথাভাঙা, অনুশাসনহীন, প্রতিবাদী, গড্ডলস্রোতে গা না ভাসানো, আনুগত্যকে তীব্র ভাবে অস্বীকার করেন বলেই বারংবার আমাদের তথাকথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী সমাজের ভন্ডামি তাঁকে ব্যঙ্গ করেছে। কোনোও দিক থেকেই পেরে ওঠেনি বলেই, তাঁর জীবনে নানারকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাঁর ক্ষমতাকে লঘু চোখে দেখে, এই শিক্ষিত হামবাগ বোনলেস চলচ্চিত্র সমালোচক, সমকালীন প্রভাবশালী পরিচালক বন্ধুরাও তাঁর পিঠে বারংবার ছুরি মারতে দ্বিধাবোধ করেনি। আর আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়ে, অনেক স্মৃতি রোমন্থন, তাঁর ছবি দেখিয়ে, বই প্রকাশ করে, যে পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমরা করে চলেছি, তাতে একটুও আমাদের দূষিত কর্মফলের ভার কমে না। আমরা সেই বাঙালি আজও, যারা মৃত্যুর পর শ্রদ্ধেয় গুণীর চিতার পাশে সমাধিফলক রচনা করে, বড়ো বড়ো বাতেলা দিয়ে কাঁদুনি গাই, কিন্তু আমরাই জীবিত অবস্থায়, দিনের পর দিন, পরিকল্পিত চক্রান্তের মধ্য দিয়ে, সেইসব গুণীদের কোণঠাসা করি। তাঁর সবকিছু আশা স্বপ্নকে পিষে, দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে আত্মিক শান্তি পাই। স্রষ্টা ঋত্বিক, দ্রষ্টা ঋত্বিক এই বাঙালিদের হাড়ে হাড়ে  চিনতেন। এরফলে তাঁর সামনে কোনোও বঙ্গজ আঁতেল  সিনেমা নিয়ে বড়ো বড়ো কথা বললে, নিজের স্বকীয় ভাষার আভিজাত্যে তাদের প্রতিআক্রমণে দিশেহারা করে দিতেন। তিনি মনেপ্রাণে সাধারণ মানুষকে ভালবাসতেন, তাদের কথা ভেবেই ছবি করতেন এবং নিজের এই কমিটমেন্ট থেকে আমৃত্যু কখনোই সরে আসেন নি। হাজার প্রলোভনকে উপেক্ষা করেছেন। নিজের সৃষ্টির সততা এবং যাপনকে কখনোই আলাদা করেন নি। 
তাই ঋত্বিকের ছবির ক্যামেরা ও সম্পাদনা , তাঁর বিষয়ভাবনা, সিনেমার সঙ্গীতের প্রয়োগ যে গভীর বোধ ও চেতনঋদ্ধ অসীমতাকে তুলে ধরে, তাতে কেবল আমরা বিস্মিতই হই না, আমাদের বিবেক - বোধ - চেতনাকে এমনভাবে আঘাত করে, জাগ্রত করে, যে সেই অমোঘ নিষ্ঠুরতা আমাদের মনেই প্রতিপ্রশ্ন জাগায় জীবনানন্দের মতো -- 
"মধ্যবিত্তমদির জগতে আমরা/ বেদনাহীন-অন্তহীন বেদনার পথে।/ কিছু নেই- তবু এই জের টেনে খেলি; / সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হ'লে হাসি;/জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে-অন্ধকারে-/মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।/তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ'য়ে /আমরা কি তিমিরবিলাসী? / আমরা তো তিমিরবিনাশী হ'তে চাই।/ আমরা তো তিমিরবিনাশী।" )

আজকের বিষয় , 

প্রদীপ চক্রবর্তীর গদ্যে 

 ঋত্বিক ঘটকের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াচিত্র
                         "নাগরিক"


কালপুরুষ 
..................

রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতির ভূমিকায় বলেছেন- "স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যাহা কিছু ঘটিতেছে, তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি অনুসারে কত কী বাদ দেয় কত কী যে রাখে।... জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে- তাহা কোন এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা।"-

বিভূতিভূষণের প্রায় সব লেখাতেই 'কালপুরুষের' প্রসঙ্গ আছে। ভারতীয় দর্শনে, উপনিষদে আছে যে কালপুরুষ যাকে ভর করে সে ঘরছাড়া হয়ে যায়, ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, কোথাও বাসা বাঁধতে পারে না। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই বিবাগী মানুষটি হলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। আপসহীন , ঋজু এই মানুষটির জীবনদর্শন ও ভাবনায় যে নিরবচ্ছিন্ন নিরঙ্কুশ সততা এবং ভাবনার দেশজ শিকড়ের অতলান্ত আহ্বান, তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে বারংবার। সমস্ত জীবনভর এক অদৃশ্য শক্তি তাঁকে চালনা করেছে। এক অদৃশ্য স্রষ্টা তাঁকে দিয়ে এমন সব কাজের ইন্ধন জুগিয়েছে যে আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যে দাবানল আজ জ্বলার কথা, তা স্ফুলিঙ্গেই আত্মঘাতী হয়েছে। আসলে, ঋত্বিকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব বাঙালী-মানসকে আন্দোলিত করেছে প্রবলভাবে। গড্ডল প্রবাহে অভ্যস্ত আমাদের জীবনকে একদিন শিকড় ধরে নাড়া দিয়ে নতুন জীবনের বার্তা শুনিয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। স্বভাবে বোহেমিয়ানা প্রতিভার বিপুল স্ফুরণকে ক্ষণস্থায়ী করলেও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করল এক 'অন্য ধারা'।



গ্রীক পুরাকাহিনীর নায়ক প্রমিথ্যুসের মতোই নিজ জীবনে অসহ্য যন্ত্রণা বরণ করে নিয়েই গৌড়জনের জন্য মধুসূদন যে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ উপহার দিয়ে গেলেন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋত্বিককুমার ঘটক সেই আগুনের সফল উত্তরাধিকারী। অথচ এই ত্রয়ীর অভ্যন্তরীণ মিলনবিন্দুকে আজও কী আমরা সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি?

Saturday, September 13, 2025

কবিতার ডালপালা | অরিজিৎ চক্রবর্তী

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা ||

কবির সামাজিক ভূমিকা / অরিজিৎ চক্রবর্তী


পরিচিত বস্তুবিশ্ব বিশেষ করে জীববিশ্ব থেকে মানুষের নিত্যদিনের গল্পগুলি তাদের কুশীলব বেছে নেয়। পৌর্বাপর্যের ঢাল বরাবর কালপট বেয়ে এরা ধাবমান। অনুকৃতির আদর্শ মেনে কর্মরত কবি, এদের কান্না হাসির জটলা থেকে বেছে নেন প্রজনন-ক্ষম একটি অন্তঃসত্ত্বা মুহূর্ত! আমরা যারা পড়ছি এবং দেখছি আত্মীয়তা এবং শখ‍্যের দাবি মেনে নৈকট্যের একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে এদের সঙ্গে। অর্থাৎ অন্ধের বর্ণের মতো শব্দের আইকনোগ্ৰাফি আমাদের জানিয়ে দেয়,"মাটি থেকে গন্ধ ওঠে, গন্ধ মাখা রুটি / খেয়ে চলে হেতু আর অহেতু প্রকৃতি।"প্রসিদ্ধ জীববিজ্ঞানী ত‍্যেলর দ‍্য সাঁদা ( Teilhard de Chardin ) Phenomenon of Man গ্ৰন্থে Biosphere এর সঙ্গে Noosphere যোগ করেছেন। কবি রাহুল পুরকায়স্থ 'হেতু' আর 'অহেতু'-র Creative imagination -এ প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষ উন্মিলীতাায় জানিয়ে দিলেন গাছ বাঁচলে মানুষ বাঁচে।

সবচেয়ে মুগ্ধ হই যখন দেখি স্হান ও কালের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া একটা ইচ্ছাকৃত বন্ধনমুক্ত রেখাহীন অস্পষ্টতা,যার আপাত কল্পলোকের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক স্পষ্ট জীবনবোধ‍্যতা, আমাকে আনত হতে বাধ্য করে।

"আহতকে প্রাণ
আমার জীবন আজও

উড়ন্ত বৃক্ষের
আজান আজান"

ক্লোরোফিলের শব্দরজ্ঞক নিয়ে কবি উড়ন্ত বৃক্ষের আজান ধ্বনির সম্প্রীতির উপনিষদ গড়ে তুললেন।সব রূপের অনিত‍্যতা যেমন স্পষ্ট হলো, তেমনি তাদের মূল ঐক‍্য ' বর্ণান্ অনেকান্ নিহিতার্থো দধাতি'। কবি প্রশ্ন রাখলেন, কোনটা সমাধান?"প্রলয়শরীর" নাকি "বিক্ষোভ,ভাসান"! কিংবা সেই তরু--"ঊর্ধ্বমূল অবাকশাখঃ এষোহশ্বথ্থঃ সনাতনঃ"---এর প্রতিধ্বনি।

কবিতার চেয়ে বিস্ময়কর পৃথিবীতে আর কিছুই নেই,থাকতে পারেনা।আর এই কবিতা বিচ্ছিন্ন কোন প্রতীতী নয়,সে সর্বোতোভাবে সমাজ ও সময় সম্পৃক্ত। তাই কবি রাহুল পুরকায়স্থ প্রণীত কাব‍্যলিপি "অন্ধের বর্ণনামতো" বইটির অনুভবী ক্রোম‍্যাটিসিটি ভাবনার আন্তরিক নৈকট্যবশত পাঠককে বলে দিতে পারে "আরও দূরে দূরাগত একা হেঁটে যায়"।

Tuesday, June 17, 2025

ষাটের যুবক | অনুরূপা পালচৌধুরী

|| ব্ল্যাকহোল পত্রিকা || ষাটের যুবক || পর্ব: ৪ ||



ষাটের যুবককে ৩য় চিঠিবাষ্পের সিন্দুক___

কল্যাণী থেকে 

         ৩য় চিঠির আস্তানায় আপাদমস্তক দুপুরটার রিংটোনে এখন আপনি অবসাদের কালবৈশাখী। অপেক্ষার ইমারতে এক একটা নূপুরের ফণায় গুনে ফেলছি নীলকণ্ঠ প্রজাপতির লোপাট বুকের শীতঝালর। 
ষাটের যুবক___ আপনাআপনি চোখ কেনো ভিজে ওঠে? জানি সে সুরম্য নদীতে আপনার দায়ভার নেই। দায় নেই মধ্যবিত্ত আমিটার অদ্ভুত আবদারচিহ্ন বাঁচাবার। না হয় একটু অন্ধকারের আরো ঘনিষ্ঠ জন্ম হোক। এ অন্ধকার আমার চিরকালীন অভ্যাসের দ্বার। দ্যাখো আঠাশের শিমূলতরবারি প্রসবহীনতায় সাতমহলা জিভের শিলমোহরে ডুবছে। প্রতিদিন নিজেকে ১বার করে পুড়িয়ে নেই আপনার রোমশ বুকের কাঁচাপাকা নিঃশ্বাসের প্রহরে। 

কথা ছিলো আসাযাওয়ার অমীমাংসিত রোদ্দুরের ছায়ায় আমার ঘরের অসুখে লেগে থাকা মাটির শীততাপে তোমার নিয়ন্ত্রিত সুখের পারদ। জানেনতো, এ শহরের অচেনা ডানায় প্রজাপতিসন্ধ্যা একান্তে জ্বলছে মৃতদেহের আড়ালে। মোচড়ানো আকাশের লালচে চোখে আমার স্বেচ্ছাচারী জীবাশ্ম শুধু তোমারই প্রশ্রয়। কতবার ভেবেছি মুখোমুখি টেবিলের ইতিহাসে পালটে দেবে তুমি এই শহরের গল্প। আজকাল চোখের ভারের চেয়ে বুকের ভার বেশী। সে ব্যাথারা কাঁদায় না। শুধু জল হয়ে গলে পড়ে দুরূহ সাদা অরণ্যের ভাঁজে। তবু আগামী দুপুরগুলো জন্ম দিই একান্ত আমার রক্তমাখা আঁতুঘুমের শরীরে। তবু কি আসবেন না আমার ভূপৃষ্ঠস্থ সূর্যসারির সমান্তরাল কবিতার তীব্র দেশান্তরে?
 
বি.দ্র. কাল দুপুরের আপেক্ষিক দক্ষিণা বাতাসের গভীরে আজকের সকাল পেড়িয়ে দুপুর। দুপুর প্রসূত সন্ধ্যা এখন রাতের অনুচর আর কাতারে কাতারে আমিটা সত্যি ভীষণরকম ভালো আছি। 
 

                      ইতি
       জন্মান্ধ কুয়াশার পুনর্জন্ম